গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গত এক মাসে শিশু-কিশোরীসহ অন্তত আটটি যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। একই ধরনের কৌশল ব্যবহার এবং প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ততা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অভিভাবকরা বলছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি শিশুদের নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
স্থানীয় সূত্র ও থানায় করা অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত উপজেলার বামনডাঙ্গা, বেলকা, দহবন্দ ও ছাপরহাটী ইউনিয়নে এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে ঘটনার সংখ্যা ৫টি। ভুক্তভোগী শিশুদের বয়স ৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার। অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন কিশোর, বাকিদের বয়স ৩৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তবে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় মামলার পর বেশিরভাগ আসামি গ্রেপ্তার হলেও অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
নারী ও শিশু সংগঠনগুলো বলছেন, শিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তা ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামাজিক সচেতনতা আর শিশুদের দিকে বার্তি নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তাদের দাবি, কার্যকর প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার ও সচেতনতা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।
মামলার তথ্য বলছে, শিশুদের বাড়ির আঙিনা বা আশপাশ থেকে ডেকে চকলেট, ফল কিংবা টাকার প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। আর শিশুরা যখন খেলাধুলা করে সেই সময়কে বেছে নেন তারা। দুপুর-বিকেল বেলার সময় গুলোতে এসব ঘটনা ঘটছে। এরপর সেখানে নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষেত্রে শিশুদের চিৎকারে স্থানীয়রা উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো একাধিক মামলা করেছে। বেশিরভাগ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তবে কয়েকজন এখনও পলাতক।
অভিভাবকরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের নিয়ে তারা চরম উদ্বেগের মধ্যে আছেন। অনেক সময় সন্তানদের একটু অসতর্কভাবে বাইরে খেলতে দিলেও ভয় কাজ করে।
তারা বলেন, বেশিরভাগ ঘটনায় দেখা যাচ্ছে প্রলোভন দেখিয়ে বা পরিচিত মুখের মাধ্যমে শিশুদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা তাদের আরও বেশি চিন্তিত করছে। আগে যেসব জায়গা নিরাপদ মনে হতো, এখন সেখানেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অভিভাবকরা আরও জানান, সন্তানদের সব সময় ঘরে আটকে রাখা সম্ভব নয়। তাই সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে স্কুল ও পরিবারে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করার ওপরও তারা গুরুত্ব দেন।
ঘটনাগুলোর মধ্যে, ২৭ মার্চ দহবন্দ ইউনিয়নের গোপালচর গ্রামে সাত বছরের এক শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে তারই প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করে ভুক্তভোগীর পরিবার। ২ এপ্রিল বেলকা ইউনিয়নের পূর্ব বেলকা গ্রামে ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়; তিনি এখনও গ্রেপ্তার এড়িয়েছেন। ৬ এপ্রিল বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে রামদেব গ্রামে তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে (৯) টাকার প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা চালানোর অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
৯ এপ্রিল বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মনিরাম কাজী এলাকায় ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে এক কিশোরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ১৩ এপ্রিল একই গ্রামে ১৬ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করে ভুক্তভোগী পরিবার। এ ঘটনায় আরেক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৪ এপ্রিল ছাপরহাটী ইউনিয়নের পূর্ব ছাপরহাটী গ্রামে ১৬ বছরের আরেক কিশোরীকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হলেও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
এরপর ২০ এপ্রিল একই ইউনিয়নের খামার মনিরাম গ্রামে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ৩ বছরের শিশুকে বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ চেষ্টা করে এক কিশোর। যদিও এই ঘটনাটি পারিবারিক চাপে মীমাংসা করতে বাধ্য করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল একই ইউনিয়নের মনিরাম কাজী গ্রামে পাঁচ বছর বয়সী আরেকটি শিশুকে ফলের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণচেষ্টা করে তারই প্রতিবেশী। এ ঘটনায় ৪০ বছর বয়সী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গাইবান্ধা জেলা মহিলা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রিক্তু প্রসাদ জানান, শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, এটা ভয়ংকর সামাজিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে, কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ নেই। এটা স্পষ্টভাবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সামাজিক উদাসীনতার ফল। অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করছে না। তিনি বলেন, দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এই নৃশংসতা থামানো যাবে না; এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ জানান, যৌন নিপীড়নের এসব ঘটনায় এক মাসে সাতটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় আসামিদের বেশিরভাগ জেলহাজতে আছেন। যারা পলাতক তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
আরটিভি/এমএইচজে



