বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে থাকা সেই নারী কুমিরটিকে অবশেষে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সম্প্রতি কুমিরটির আক্রমণে আট বছর বয়সী শিশু ফাতেমার মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হলে প্রশাসন, বন বিভাগ ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বুধবার (৩ জুন) দুপুরে কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘির কুমির দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত ছিল। একসময় মাজারের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত ‘ধলাপাহাড়’ ও ‘কালাপাহাড়’ নামে দুটি কুমির ছিল এই দিঘিতে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ভারত থেকে আনা কুমিরগুলো এখানে অবমুক্ত করা হয়। শত শত বছর ধরে কুমিরকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি ও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত থাকলেও সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর জননিরাপত্তার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত সোমবার রাতে মাজার সংলগ্ন দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারায় শিশু ফাতেমা। ওই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা, দর্শনার্থী ও বিভিন্ন মহলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় জনস্বার্থে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
বুধবার সকাল থেকে বন বিভাগের কুমির বিশেষজ্ঞ, বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মী এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাজার এলাকায় অবস্থান নেন। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর বেলা ১১টার দিকে দিঘির পূর্বপাড়ের একটি ছোট পুকুরে কুমিরটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে বিশেষ কৌশলে প্রাণীটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় কুমিরটির হাত-পা ও চোখ বেঁধে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে বন বিভাগের গাড়িতে করে সেটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
এদিকে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মাজার এলাকায় স্বস্তি ফিরে আসে। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কাটিয়ে অনেক দর্শনার্থী আবারও দিঘির ঘাটে যেতে শুরু করেন।
ঢাকা থেকে মাজার জিয়ারতে আসা মো. সোহেল রানা বলেন, শিশু ফাতেমার মৃত্যুর ঘটনা খুবই হৃদয়বিদারক ছিল। কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আমরা স্বস্তি পেয়েছি। এখন পরিবার নিয়ে এখানে আসতে কিছুটা নিরাপদ মনে হচ্ছে।
খুলনা থেকে আসা দর্শনার্থী মো. আব্দুর রহিম বলেন, ঐতিহ্য অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে, তবে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সবার আগে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী হয়েছে।
দর্শনার্থী রোকসানা বেগম বলেন, ঘটনার পর থেকে সন্তানদের নিয়ে ঘাটের কাছে যেতে ভয় লাগছিল। কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ায় এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করছি।
আরেক দর্শনার্থী মাধবী রানী পাল বলেন, মাজারে প্রতিবছর আসি। এমন দুর্ঘটনা আর যেন না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, জননিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত প্রাণীটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হবে। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্র। তাই ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের আশা, ভবিষ্যতে এমন কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে দিঘির চারপাশে আরও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
আরটিভি/এমএইচজে




