গাজীপুরের শ্রীপুরে এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. ফারহানা শারমিনকে (২৭) অপহরণ করে জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে মাহবুব হাসান রায়হান (৩৩) নামে আরেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করলে পুলিশ প্রধান আসামি চিকিৎসক মাহবুব হাসান রায়হানকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। মামলার অপর আসামিরা হলেন- রায়হানের সহযোগী শ্রীপুর পৌরসভার লোহাগাছ এলাকার রিফাত (৩৩), নাফিজ (২৫), আজমল (৩২), রায়হানসহ (২৫) অজ্ঞাত ৩ জন।
শনিবার (৬ জুন) বিকেলে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক ফারহানা শারমিন ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দুর্গাপুর (তেলজুড়ী) গ্রামের মহসিন শিকদারের মেয়ে।
অভিযুক্ত মাহবুব হাসান রায়হান শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের বাউনী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মাঝে মধ্যে অন কলে রোগী দেখতেন।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক ফারহানা শারমিন মামলার এজাহার উল্লেখ করেন, তিনি এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় চিকিৎসক মাহবুব হাসান রায়হান মাঝে মধ্যে অন কলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখতে আসতেন। এ সময় রায়হানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের এক পর্যায়ে রায়হান প্রথমে প্রেম ও পরে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। সম্প্রতি তিনি ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং কর্তৃপক্ষকে জানান। চাকরি ছেড়ে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে শেষ বারের মতো তার সঙ্গে চা খাওয়ার অনুরোধ করেন রায়হান। সরল বিশ্বাসে তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গত ২৬ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কর্মস্থল থেকে উপজেলার বরমী ইউনিয়নের সাতখামাইর রেলস্টেশনের সংলগ্ন ভাইরাল চা স্টলে যান। পরে রাত সাড়ে ৮ টার দিকে অটোরিকশাযোগে শ্রীপুর যাওয়ার পথে সাতখামাইর-শ্রীপুর সড়কের গাড়ারন (পল্লি বিদ্যুতের পাওয়ার স্টেশনের) সামনে পৌঁছালে একটি কালো রঙের প্রাইভেটকার তার অটোকশার সামনে দাঁড়ায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আসামি রিফাত, নাফিজ, আজমল, রায়হানসহ তাদের সহযোগী অজ্ঞাত ৩ জন ফারহানা শারমিনের মুখ চেপে ধরে, গলায় ছুরি ঠেকিয়ে জোরপূর্বক প্রাইভেটকারের ভেতরে তুলে নেয়। তারা ফারহানার কাছ থেকে মুঠোফোন ও স্বর্ণের আংটি কেড়ে নিয়ে তাকে জিম্মি করে ফেলেন। পরে তারা তার চোখ বেঁধে শ্রীপুরের বিভিন্ন বনাঞ্চল ও নির্জন এলাকায় ঘোরাতে থাকেন। এরপর একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে এশিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষের কাছে মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে সেখান থেকে অন্যত্র নিয়ে হত্যার হুমকি এবং আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করার ভয় দেখান। এক পর্যায়ে তারা প্রধান আসামি মাহবুব হাসান রায়হানের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে গলায় ছুরি ধরে মারধর করে প্রাণনাশের হুমকি দেন। তারা বলেন- কোনোপ্রকার আপত্তি করলে হত্যা করে গভীর জঙ্গলে লাশ গুম করে ফেলবেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, গভীর রাতে তাকে একটি নির্জন টিনশেড ঘরে নিয়ে একজন কাজীকে সেখানে ডাকেন। এ সময় তারা ভুক্তভোগীর মুঠোফোন থেকে জোরপূর্বক জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করে প্রধান আসামির সঙ্গে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। তারা কাবিননামা এবং তিনটি খালি স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ নিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। এরপর ২৭ মে রাত পৌনে ৩টার দিকে নারী চিকিৎসককে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় নামিয়ে দেয় এবং বিষয়টি কাউকে জানালে চিকিৎসক ও তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দিয়ে তারা চলে যায়। প্রধান আসামি পরিকল্পিতভাবে তার সহযোগীদের নিয়ে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সুরুজ্জামান বলেন, নারী চিকিৎসকের লিখিত অভিযোগে শুক্রবার মামলা রুজুর পর আসামি মাহবুব হাসান রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিন দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামির দেওয়া তথ্যে তার নিজ বাড়ি থেকে তার বাবার উপস্থিতিতে ভুক্তভোগী চিকিৎসকের স্বাক্ষরিত তিনটি খালি স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়।
এসব বিষয়ে চিকিৎসক ফারহানা শারমিনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, সম্মানিত মিডিয়ার ভাইগণ, আমার সাথে অন্যায় হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমি মামলা করেছি এবং আমি মানসিকভাবে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছি। বিষয়টা মামলাধীন বিধায় আমি আপাতত এ নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। ধন্যবাদ আপনাদের প্রতি।
আরটিভি/এমএইচজে



