বিশাল এক আমবাগান। গাছে গাছে ঝুলছে নানা জাতের রঙিন আম। তবে নজরকাড়া ১০ বিঘার এই বিশাল বাগান পাহারায় কোনো মানুষ নেই; বরং দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বাগান সুরক্ষার মূল দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে দেশি জাতের দুটি বিশ্বস্ত কুকুর। ভালোবেসে যাদের নাম রাখা হয়েছে ‘লালু’ ও ‘কালু’। এক দুর্ঘটনায় লালু তার একটি পা হারালেও বাগান রক্ষায় তার সাহসিকতা ও বিশ্বস্ততায় এতটুকুও চিড় ধরেনি।
নওগাঁ পৌর এলাকার আনন্দনগর বাগবাড়ি এলাকায় মিশ্র জাতের এই আমবাগান গড়ে তুলেছেন চাষি আব্দুল আলিম। বারি-৪সহ বিভিন্ন বিদেশি রঙিন আমে সমৃদ্ধ এই বাগানে কর্মচারী থাকলেও পাহারাদার হিসেবে আলিমের প্রধান ভরসা এই দুই চতুষ্পদ প্রাণী। তারা এখন শুধু পাহারাদারই নয়, হয়ে উঠেছে পরিবারের সদস্য।
বাগান মালিক আব্দুল আলিম জানান, শৈশবে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পরম যত্নে কুকুরছানা দুটিকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। একটি লাল-সাদা রঙের হওয়ায় নাম রাখা হয় ‘লালু’, অন্যটি কালো-সাদা হওয়ায় ‘কালু’। সময়ের ব্যবধানে তারা পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
আলিম বলেন, ওরা আমাদের পরিবারের সদস্যের মতোই। বিশাল এই বাগানে পাহারাদার রাখলে যে অতিরিক্ত খরচ হতো, লালু-কালুর কারণে তা বেঁচে যাচ্ছে। আমরা নিজেরা যা খাই, ওরাও তাই খায়। তবে ওদের হিংস্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঝে মাঝে সেদ্ধ মাংস দেওয়া হয়। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত টিকাসহ সব ধরনের যত্ন নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই বাগানে অপরিচিত কোনো মানুষের প্রবেশ একপ্রকার অসম্ভব। লালু ও কালুর বাধা উপেক্ষা করে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারে না। তবে পরিবারের কেউ সঙ্গে থাকলে তারা শান্ত থাকে। শুধু বাগান পাহারাই নয়, আলিমের মেয়ের সঙ্গী হয়ে প্রতিদিন তাকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং বিকেলে খেলাধুলা—সবখানেই ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে এই দুই সঙ্গী। তাদের এমন রাজকীয় বিশ্বস্ততা ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ প্রতিবেশীরাও।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, একসময় কুকুর পালন শহরকেন্দ্রিক বা কেবল শখের বিষয় হলেও বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কাজে মানুষ কুকুর লালন-পালন করছে।
তিনি বলেন, এখন বিশ্বস্ত ও উপকারী প্রাণী হিসেবে মানুষ এদের লালন-পালন করছে। নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিলে এদের মাধ্যমে মানুষের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। সঠিক যত্ন নিলে এরা মানুষের উপকারে আসে।
সঠিক যত্ন, উপযুক্ত চিকিৎসা ও ভালোবাসা পেলে যে কোনো প্রাণীও মানুষের পরম বন্ধু এবং বিশ্বস্ত পাহারাদার হয়ে উঠতে পারে। তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নওগাঁর ‘লালু’ ও ‘কালু’।
আরটিভি/টিআর




