প্রচলিত নিয়ম উধাও: মান্দায় ধানের হাটে ‘৪১ কেজিতে মণ’, জিম্মি কৃষকরা

মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ , ০৪:০৭ পিএম


প্রচলিত নিয়ম উধাও: মান্দায় ধানের হাটে ‘৪১ কেজিতে মণ’, জিম্মি কৃষকরা
মান্দা উপজেলার একটি ধানের হাট : ছবি আরটিভি

দেশের প্রচলিত ওজন পরিমাপের নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজিতে এক মণ ধান হওয়ার কথা। কিন্তু নওগাঁর মান্দা উপজেলার বিভিন্ন ধানের হাটে সেই নিয়ম যেন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। উপজেলার ঐতিহাসিক পাঁজরভাঙ্গা হাটসহ একাধিক বাজারে কৃষকদের বাধ্য করা হচ্ছে প্রতি মণে ৪১ কেজি ধান দিতে। এতে বছরের পর বছর ধরে ওজনে অতিরিক্ত ধান দিয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন হাজারো কৃষক।

সরেজমিনে শুক্রবার (১৯ জুন) উপজেলার ঐতিহাসিক পাঁজরভাঙ্গা হাট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ভ্যান, ভটভটি ও সাইকেলে করে ধান নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। হাটজুড়ে ধানের ব্যাপক আমদানি থাকলেও বিক্রির সময় কৃষকদের পড়তে হচ্ছে এক অঘোষিত নিয়মের মুখে। ব্যবসায়ীরা ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪১ কেজিকে এক মণ ধরে ধান কিনছেন। শুধু পাঁজরভাঙ্গা নয়, উপজেলার জোতবাজার ও জোকাহাটের চিত্রও একই রকম।

আরও পড়ুন

বর্তমানে হাটে বিভিন্ন জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে জিরা ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৪০০ টাকা, সুবলতা ১ হাজার ৩৪০ টাকা, কাটারি ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ১ হাজার ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারে ধানের দাম কম হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন দেওয়ার কারণে কৃষকদের ক্ষোভ বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অনিয়ম চালিয়ে আসছে। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও কার্যকর তদারকি না থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ধান দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে প্রতি মণে ১ কেজি করে ধান বেশি দিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা। বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রকাশ্য ওজন জালিয়াতি বন্ধে এবং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।

হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মো. জহুরুল বলেন, আমি ১২ মণ ধান নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ৪১ কেজিতে মণ ধরায় ১২ কেজি ধান বেশি চলে গেছে। আমরা অনেক কষ্ট করে ধান উৎপাদন করি। হাটে আনলে ব্যবসায়ীরা বলে ৪০ কেজিতে ধান নেবে না, ৪১ কেজি দিতে হবে। বাধ্য হয়ে আমরা ধান বিক্রি করি।

আরেক কৃষক মো. আজিজার বলেন, ৫ মণ ধান নিয়ে এসেছিলাম। ধানের দামও কম, আবার প্রতি মণে ১ কেজি বেশি দিতে হয়েছে। প্রশাসনের এ বিষয়ে কোনো নজরদারি নেই। আমরা সব দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

আরও পড়ুন

ওজনে অতিরিক্ত ধান নেওয়ার এই প্রকাশ্য অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে হাটের কয়েকজন ধান ব্যবসায়ী বিষয়টি অনিয়ম বলে স্বীকার করলেও, দায় চাপাচ্ছেন দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ওপর।

ধান ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. মেস্তাক বলেন, এই হাটে অনেক আগে থেকেই ৪১ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। সবাই এভাবেই নিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজি হলেও বাজারে দীর্ঘদিন ধরে এই পদ্ধতি চলে আসছে।

এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, হাট-বাজারে ওজন সংক্রান্ত অনিয়ম এবং কৃষক ও ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ নিয়মিত তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যে কোনো কৃষিপণ্য বা ফলের ক্ষেত্রে ৪০ কেজি মানে ৪০ কেজিই। আইনত বাড়তি বা ‘ঢলন’ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কৃষকেরা সচেতন হলে এবং প্রশাসন নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে এ ধরনের অনিয়ম দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব। বাজারমূল্য ওঠানামা করলেও পণ্যের ওজন অবশ্যই সঠিক থাকতে হবে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission