ভোলার মনপুরায় যাতায়াতের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মাধ্যম বিআইডব্লিউটিসি-এর সি-ট্রাকটি দীর্ঘ ৬ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন দ্বীপে যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শত শত যাত্রী। প্রমত্তা মেঘনার ‘ডেঞ্জার জোনে’ সি-সার্ভে (সমুদ্র চলাচল উপযোগী সনদ) ব্যতীত অন্যান্য সাধারণ নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ মালবাহী ট্রলারে চড়ে প্রতিদিন উত্তাল নদী পাড়ি দিচ্ছেন দ্বীপের বাসিন্দারা।
অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ নৌযানে দ্বীপটিতে চলাচলে স্থানীয় প্রশাসন বা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তদারকি না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপর বেড়েই চলছে। ফলে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার আগেই জরুরি ভিত্তিতে অবৈধ নৌযান বন্ধ করে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
শনিবার (২৭ জুন) তজুমদ্দিন ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, মনপুরা থেকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে তজুমদ্দিন ঘাটে এসে পৌঁছায় পণ্য পরিবহনের একটি কাঠের ট্রলার। এতে কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট বা যাত্রী পরিবহনের বৈধ অনুমতি নেই। ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ট্রলারের খোন্দলের (ভেতরের অংশ) ভেতরেই গাদাগাদি করে বসে আছেন নারী ও শিশুরা।
বিকেল ৩টায় ফিরতি ট্রলারে আবারও তোলা হয় শতাধিক যাত্রী। যেখানে বসার কোনো সুব্যবস্থা বা লাইফ জ্যাকেটের মতো ন্যূনতম নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। একই খোন্দলে মানুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে নেওয়া হচ্ছে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও ভারী মালামাল। প্রচণ্ড গরম ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে জীবন হাতে নিয়ে মেঘনা পাড়ি দিচ্ছে এই মানুষগুলো।
ভুক্তভোগী যাত্রী মনপুরা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আমিমুল এহসান জসিম তার স্ত্রীকে নিয়ে ট্রলারে বসার জায়গা না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ পন্টুনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাধ্য হয়ে মনপুরার মানুষ গত ৬ মাস ধরে এভাবে যাতায়াত করছেন তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চরম ভোগান্তি নিয়ে ট্রলারে যাত্রা করা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার মতই। একাধিকবার উপজেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে বিষয়টি জানানো হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে সি-ট্রাকটি বন্ধ রাখা হয়েছে। মনপুরার মানুষের স্থায়ী স্বস্তির জন্য এই রুটে একটি নতুন ও আধুনিক সি-ট্রাক বরাদ্দ দেওয়া হোক।
স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে মনপুরা যাওয়ার জন্য ঘাটে আসা হাজিরহাট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার ট্রলারের দুরাবস্থা ও নদীর উত্তাল ঢেউ দেখে ভয়ে ট্রলারে উঠতেই সাহস পাননি। তিনি বলেন, মনপুরার প্রতিটি মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন।
উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা আলী আকবর বলেন, মাঝনদীতে হঠাৎ ঝড়-বাদল শুরু হলে নারী ও শিশুদের কান্নার রোলে ট্রলারের ভেতর এক নারকীয় পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ আইন ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে।
ঘাট সূত্রে জানা গেছে, তজুমদ্দিন-মনপুরা রুটে নিরাপদ পারাপারের জন্য বিআইডব্লিউটিসির ‘এসটি ইলিশা’ নামের একটি সি-ট্রাক বরাদ্দ ছিল, যা গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে অচল পড়ে আছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ ৮ মাস মেঘনা নদীর ১১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময়ে সি-সার্ভে সনদ ছাড়া কোনো নৌযানে যাত্রী পরিবহন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ মনপুরা-তজুমদ্দিনসহ ভোলার ১০টি রুটে এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উপেক্ষা করে যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে।
যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিসির উপ-বাণিজ্য ব্যবস্থাপক (যাত্রী) খন্দকার মুহাম্মদ তানভী হোসেন বলেন, মূলত যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ইজারা সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি বন্ধ ছিল। তবে আমরা সব জটিলতা কাটিয়ে উঠেছি। শিগগিরই এই রুটে পুনরায় সি-ট্রাক চালু করা হবে।
এদিকে, সম্প্রতি ভোলা সফরকালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্বীপ অঞ্চলের নাগরিকদের যাতায়াত সুগম করতে সরকারি বা বেসরকারি খাত—যেখান থেকে সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে মানসম্মত জাহাজ দেওয়ার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরটিভি/এমএম




