পাবনার বেড়া উপজেলায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। ভাঙনের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন), একটি জামে মসজিদ, অসংখ্য বসতবাড়ি ও শত শত বিঘা ফসলি জমি। দ্রুত জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় যমুনা নদীর ভাঙন দেখা দিলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কল্যাণপুর চর। সেখানে ভাঙন দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ভাঙনের স্থানটি স্থানীয় মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ ফুট এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন) থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে হলেও স্থাপিত সাবমেরিন ক্যাবল মাত্র ৫০ ফুট দূরে রয়েছে। ক্যাবলটি ভাঙনের কবলে পড়লে চরের হাজারো মানুষ বিদ্যুৎ সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। প্রায় এক মাস আগে শুরু হওয়া এ ভাঙন এখন পুরো এলাকার মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদীর তীর প্রতিনিয়ত ধসে পড়ায় মসজিদ, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন), ফসলি জমি ও বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙনের অগ্রগতি অব্যাহত থাকায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে স্থানীয় মসজিদ ও বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, চলমান ভাঙনে গত একমাসে প্রায় ২০০ বিঘা ফসলি জমি ইতোমধ্যে যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে অনেক কৃষক তাদের আবাদি জমি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একদিকে যেমন মূল্যবান কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি, মসজিদ এবং বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ভাঙনের গতি অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বর্ষার বাকি সময়জুড়ে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
কল্যাণপুর চরের বাসিন্দা মো. তাইজল ইসলাম বলেন, গত এক মাসে যমুনা নদীর ভাঙনে আমার প্রায় ৪ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর আগেও কয়েক বিঘা জমি ভাঙনের শিকার হয়েছে। এখন চাষাবাদ করার মতো কোনো জমি অবশিষ্ট নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে আমি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি।
তাইজল ইসলামের মতো একই দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন এলাকার আরও অনেক কৃষক। স্থানীয়দের ভাষ্য, যমুনার অব্যাহত ভাঙনে মো. শুকুর আলী, মো. কামাল হোসেন, মো. ইসমাইল হোসেন ও হযরত আলীসহ অসংখ্য কৃষকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের শিকার হয়ে অনেকেই তাদের জমিজমা হারিয়ে প্রায় ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। কৃষিকাজই ছিল তাদের পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। কিন্তু একের পর এক জমি হারানোর ফলে তারা এখন চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙনের কারণে ফসল উৎপাদনের সুযোগ হারিয়ে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছে।
পুরানভারেঙ্গা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রেজাউল করিম বলেন, গত এক মাসে শুধু কল্যাণপুর চর এলাকাতেই প্রায় ১০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এদিকে ভাঙনকবলিত স্থান থেকে মাত্র ৫০ ফুট দূরে একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন) ও একটি মসজিদ অবস্থান করায় স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাগুলোও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি বসতভিটা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নেওলাইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনার ভাঙন দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করায় আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। সব সময় মনে হয়, কখন না আবার নদীর পাড় ভেঙে আমাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে যায়। আমরা চাই, ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়ার আগেই সরকার দ্রুত নদী রক্ষা কাজ শুরু করে মানুষের জানমাল ও বসতভিটা রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বেড়া শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, যমুনা নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনায় কল্যাণপুর চরসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে দুটি প্যাকেজের আওতায় প্রায় ১২ হাজার জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ভাঙনরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে অতিরিক্ত প্যাকেজ গ্রহণ এবং জিওব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
আরটিভি/এসএস



