শয্যাশায়ী অবস্থায় জীবিকার লড়াই মাহাতাবের

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০৩:৪৫ পিএম


শয্যাশায়ী অবস্থায় জীবিকার লড়াই মাহাতাবের
ছবি: আরটিভি

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না, ও বন্ধু’—ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে ৫৫ বছর বয়সী মাহাতাব হোসেনকে স্কুলের বারান্দায় শয্যাশায়ী অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।

শরীরের প্রায় পুরো অংশই অসাড়। নেই মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই। মাত্র ১২ বছর বয়সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার পুরো শরীর অসাড় হয়ে যায়। অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসা। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ভাই-বোনদের অবহেলায় পৈতৃক ভিটা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। তবুও ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেননি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের ভাটড়া শেখপাড়া গ্রামের মো. মাহাতাব হোসেন (৫৫)।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অচল শরীর পাথরের মতো শক্ত। তবুও তিনি কোনো প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি। তার দুই পা ও এক হাত অবশ হয়ে গেলেও সচল হাত দিয়ে হাতপাখার হাতল তৈরি করে প্রতিটি ৩৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে শয্যাশায়ী এই মানুষটির বর্তমান ঠিকানা স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা। তবে তার দেখভাল করার মতো কেউ নেই। প্রতিবেশী এক নারী প্রতিদিন তাকে খাবার দেন এবং মাঝেমধ্যে গোসল করিয়ে দেন। এত কষ্টের মাঝেও তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাহাতাবের জন্ম এই গ্রামেই। একসময় তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা সবই ছিল। কিন্তু ছোটবেলায় একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা তার সব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকেই বিদ্যালয়ের এই বারান্দাই তার স্থায়ী আশ্রয়।

এদিকে, গত ১৩ বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে মাহাতাবের দেখভাল করছেন স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. হাসিনা বেগম। তিনি বলেন, মাহাতাব ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে আমাদের খুব খারাপ লাগত। তার দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। তাই স্বামীর সঙ্গে কথা বলে গত ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে আমরা দুজন তার দেখভাল করছি। সময় পেলেই তাকে খাবার দিই। গোসল করানো, কাপড় ধুয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে তার প্রয়োজনীয় সব কাজই আমরা করি।

প্রতিবেশী মো. আব্দুল জব্বার বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে মাহাতাব হোসেন এভাবেই পড়ে আছেন। তার মা-বাবা বা ভাই-বোন কেউ নেই। মানুষ যা খেতে দেয়, তাই খেয়ে বেঁচে আছেন। তার যদি একটি থাকার ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো, তাহলে গ্রামবাসী হিসেবে আমরা খুবই খুশি হতাম।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. লিটন মিয়া বলেন, তিনি আমাদের গ্রামের বাসিন্দা এবং একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। ইচ্ছা করলে ভিক্ষাবৃত্তি করে চলতে পারতেন। কিন্তু তা না করে হাতপাখার হাতল তৈরি করে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। আমি সরকারের কাছে তার জন্য একটি বসবাসের ঘরের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মাহাতাব হোসেন এই বিদ্যালয়ের বারান্দায় থাকেন। এতে অনেক সময় আমাদেরও কিছু সমস্যা হয়। তবুও মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে এখানে থাকতে দেওয়া হয়েছে। জীবনের শেষ সময়টুকু যেন তিনি একটু স্বস্তিতে কাটাতে পারেন, সে জন্য তার একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে মাননীয় সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করছি।

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, মাহাতাব হোসেনের বিষয়টি জানার পর প্রায় এক মাস আগে আমি নিজে সরেজমিনে গিয়ে তার খোঁজখবর নিয়েছি এবং তাকে দুই বান্ডিল টিন দিয়েছি। ভবিষ্যতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission