নড়াইলে সাবাড় ৫০০ শতবর্ষী গাছ, অবশিষ্টগুলো রক্ষার দাবি

নড়াইল প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০২:৫০ পিএম


নড়াইলে সাবাড় ৫০০ শতবর্ষী গাছ, অবশিষ্টগুলো রক্ষার দাবি
শতবর্ষী দুটি গাছ। ছবি: আরটিভি

শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে গড়া নড়াইল জেলা। মোঘল আমল কিংবা জমিদারি শাসনামলের স্মৃতি বুকে নিয়ে একসময় এই জনপদে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষ। কিন্তু কালের বিবর্তনে আর মানুষের নির্মমতায় হারিয়ে যাচ্ছে এসব সবুজ ঐতিহ্য। গত এক দশকে উন্নয়ন আর অবহেলার অজুহাতে কেটে ফেলা হয়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক শতবর্ষী প্রাচীন গাছ। বর্তমানে জেলাজুড়ে যে গুটিকয়েক গাছ টিকে আছে, সেগুলোও এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের দাবি দ্রুত তালিকা তৈরি করে এই জীবন্ত ইতিহাসগুলোকে সংরক্ষণ করা হোক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন জমিদাররা নড়াইল অঞ্চলের পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও ছায়াময় আবাসের জন্য রোপণ করেছিলেন বিশাল আকৃতির তেঁতুল, আম, গাব, হিজল, পাকুড় ও বটবৃক্ষ। জমিদাররা দেশ ছাড়লেও গাছগুলো টিকে ছিল শত বছর ধরে। কিন্তু গত ১০ বছরে জেলার বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাসজমি এবং নদ-নদীর তীর থেকে অন্তত ৫০০টি প্রাচীন গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে।

বর্তমানে পুরো জেলায় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে মাত্র অর্ধশতাধিক গাছ টিকে আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, জেলা বন বিভাগের কাছে এসব গাছের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা বা পরিসংখ্যান নেই। বন অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন সময় ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী বৃক্ষের তালিকা তৈরির নির্দেশনা থাকলেও নড়াইল বন বিভাগের উদাসীনতায় তা আলোর মুখ দেখেনি।

প্রাচীন এই গাছগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নড়াইলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবেগ।

বৃক্ষপ্রেমী যাযাবর মনির বলেন, এই গাছের ছায়াতেই একসময় গ্রামের সালিশ-বিচার ও সামাজিক বৈঠক হতো। কোনো কোনো গাছের নিচে বসেই শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন, কবিরা কবিতা লিখেছেন, গীতিকাররা গান বেঁধেছেন।

লোহাগড়ার সমাজকর্মী হাসান মাহমুদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবহেলা, ভূমি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন এবং সচেতনতার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশের পুরোনো বৃক্ষগুলো।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম বলেন, এসব বৃক্ষকে শুধু পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে নয়, জেলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি মো. শাহ আলম এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। তিনি অবিলম্বে টিকে থাকা গাছগুলোর তালিকা করে তা সংরক্ষণের জোর দাবিম জানান।

বিজ্ঞান ও পরিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক কেয়া রেণু রায় বলেন, একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি হতে শত বছর সময় লাগে, কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি কেটে ফেলা হয়। এসব গাছ কেবল অক্সিজেন দেয় না; জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং অসংখ্য পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে।

আরও পড়ুন

নড়াইল সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ফরেস্ট রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) কাজী ইশতিয়াক রহমান নতুন দায়িত্বে আসার কথা জানিয়ে স্বীকার করেন যে, বর্তমানে তাদের কাছে কোনো তালিকা নেই। তবে দ্রুত একটি তালিকা তৈরি করে গাছগুলো সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে, নড়াইলের জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, জেলার শতবর্ষী গাছগুলো সংরক্ষণ করা হবে এবং এ ব্যাপারে দ্রুত কাজ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে নড়াইল সদর, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলার তিনটি বিশেষ গাছের চারপাশে ইটের গাঁথুনি দিয়ে পথচারীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হবে।

একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রাচীন গাছগুলোও নিজ নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।

পরিকল্পনার অভাব ও চরম অবহেলায় একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে নড়াইলের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। অবশিষ্ট গাছগুলো রক্ষায় এখনই যদি কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেবলই ‘গল্প’ বা ‘স্মৃতি’ হয়ে রয়ে যাবে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission