টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে নওগাঁ পৌরসভায়। জেলা শহরের অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ঘরবাড়ি ও রাস্তায় পানি জমে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। এমনকি জলাবদ্ধতার কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চলমান পরীক্ষাও স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই এই স্থায়ী দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৮ জুলাই) মধ্যরাত থেকে হঠাৎ শুরু হওয়া তীব্র বৃষ্টিতে এক রাতের ব্যবধানেই জলমগ্ন হয়ে পড়েছে পুরো নওগাঁ শহর। বৃষ্টিতে জেলা শহরের সিংহভাগ এলাকা তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে পৌর এলাকার সাহেবপাড়া, চামড়াগুদাম, সরিষাহাটির মোড়, মাস্টার পাড়া, বিহারী কলোনি এবং বিএমসি মোড়সহ প্রধান প্রধান সড়কগুলো এখন পানির নিচে। কোথাও কোথাও হাঁটু পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এই আকস্মিক জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেই সকালে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা কেন্দ্রে হাজির হলেও, কেন্দ্রের চারপাশ ও রাস্তা তলিয়ে থাকায় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে। ফলে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই বাড়ি ফিরতে হয় শিক্ষার্থীদের।
ভুক্তভোগী পৌরবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পৌর এলাকায় কোনো পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিদ্যমান ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এবং পানি নিষ্কাশনের সঠিক পথ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট উপচে পানি ঢুকে পড়ছে বসতবাড়ির ভেতর। অনেকের ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় রান্নাবান্না ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি ঢুকে পড়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী মানুষ দ্রুত পরিকল্পিত ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
রাস্তায় বের হওয়া রিকশাচালক আব্দুস সালাম বলেন, রাস্তায় হাঁটু পানি জমে থাকায় রিকশা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গর্ত দেখা যায় না, যেকোনো সময় উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে। আজ সকাল থেকে কোনো আয় করতে পারিনি, পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
পানিবন্দি হয়ে পড়া গৃহবধূ মীম বলেন, ঘরের ভেতর পানি ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চুলা জ্বালানোর উপায় নেই, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে চরম বিপদে আছি। আমরা এই জলজট থেকে স্থায়ী মুক্তি চাই।
শহরের এই দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের পেছনে পানি নিষ্কাশনের মূল পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দায়ী করছে প্রশাসন।
পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, গত তিন দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ মাত্র কয়েক বছরে পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। নওগাঁ পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক টি এম এ মমিন মুঠোফোনে জানান, শহরের পানি যেদিক দিয়ে বাইরে নিষ্কাশন হতো, সেই প্রাকৃতিক খাল ও নিচু জায়গাগুলোতে জমির মালিকরা বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফেলেছেন। পানি প্রবাহের মূল পথগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণেই এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে সমস্যা সমাধানে পৌর কর্তৃপক্ষ বসে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অপরিকল্পিত ও অচল ড্রেনগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন করে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজ শুরু করা হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই পৌরবাসী এর সুফল পাবেন এবং জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন।
কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের বাণী দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নওগাঁর সাধারণ মানুষ এই স্থায়ী জলজট থেকে স্থায়ী মুক্তি পাবে— এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
আরটিভি/এমএইচজে



