বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে নিহত বেড়ে ২৮

আরটিভি নিউজ

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬ , ০৮:৪৪ পিএম


বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে নিহত বেড়ে ২৮
ছবি: সংগৃহীত

টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে ভোগান্তি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বন্যা ও পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় কক্সবাজারে মোট ২৮ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।

রোববার (১২ জুলাই) কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

স্থানীয়রা জানান, শনিবার (১১ জুলাই) দিনে কিছুটা কমেছিল বৃষ্টি। বৃষ্টি কমায় বন্যার পানিও কিছুটা নেমে গিয়েছিল। তবে রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত আবারও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। দুর্গত মানুষগুলো খাবার এবং পানীয় জলের সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিও বেড়েছে পাহাড়ধসের। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে নিরাপদে সরে যেতে মাইকিংসহ নানাভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন। তবে, চাহিদার তুলনায় এসব ত্রাণ অপ্রতুল বলে দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।

রোববার (১২ জুলাই) চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার সদর এবং উখিয়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ কালে তিনি বলেন, বন্যার্তদের ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় মানবিক সহায়তা অপর্যাপ্ত- সরকারি সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি।

কক্সবাজার সদর আসনের এমপি লুৎফুর রহমান কাজল রামু, ঈদগাঁও, কক্সবাজার সদর এলাকার বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও পাহাড় ধ্বসে নিহতদের পরিবারে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। ত্রাণ বিতরণে দুর্গতদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন জেলা ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ। পেকুয়াতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে ছফুয়ানুল করিমের নেতৃত্বে দিনে এবং রাতে শুকনো খাবার, পানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে জেলায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মাঝে কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে এক নারী এবং পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে কক্সবাজারে চলমান দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে। 

পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী মুশফিকুর রহিম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার প্রবাসী নাছির উদ্দীনের ছেলে।

আরও পড়ুন

স্থানীয়রা জানান, শিশুটির ঘরে হাঁটুসমান এবং উঠানে কোমরসমান পানি জমে ছিল। এ সময় শিশুটিকে ঘরে রেখে বাইরে কাজ করছিলেন তার মা। একপর্যায়ে সবার অগোচরে শিশুটি পানিতে পড়ে স্রোতে ভেসে যায়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা অনেক খোঁজাখুঁজির পর ঘর থেকে প্রায় দেড়শ ফুট দূরে ভাসমান অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অনেক এলাকায় এখনও পানি রয়েছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউপির পূর্ব কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে রোজিনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। তিনি ওই এলাকার আব্দুল মজিদের স্ত্রী।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন জানান, রাতের খাবারের প্রস্তুতির জন্য পাহাড়ঘেঁষা রান্নাঘরে অবস্থান করছিলেন রোজিনা বেগম। এসময় হঠাৎ পাহাড়ধসে পড়লে ঘরসহ তিনি মাটিচাপা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ঘন্টা দুয়েক পর তাকে উদ্ধার করলেও বাঁচানো যায়নি। এসময় স্বামী আব্দুল মজিদ সন্তানসহ দোকানে ছিলেন বলে জানাগেছে।

আব্দুল মজিদ বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকায় তিনি স্ত্রীকে বারবার রান্নাঘরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু রাতের খাবার প্রস্তুত করতে গিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।

কক্সবাজার সদরের ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেন, টানা বৃষ্টিতে জেলার ক্ষতবিক্ষত পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হলেও অনেকেই আবার পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে ফিরে আসছেন। টানা বর্ষণের সময় পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা দরকার। ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। মাইকিংসহ ফোর্সও করা হলেও বাড়ি ছেড়ে না যাওয়ায় অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটছেই। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের ঢাল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করা উচিত নয়।

ইউএনও আরও বলেন, গত ৭ জুলাই বিকেলে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দরিয়ানগর বড়ছড়া হাজীঘোনা এলাকায় পাহাড় ধ্বসে লিমা আক্তার (২৫) মারা যান। এসময় তার স্বামী জসিম উদ্দিনও আহত হন। বৃষ্টির মাঝে মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি এলাকায়ও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। বৃষ্টি দুর্যোগকালীন সময়ে সবাইকে নিরাপদে থাকার আহবান জানান ইউএনও।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও কয়েকদিন মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, জেলার দুর্গত উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সবসময় প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার আহ্বান জানান ডিসি। সপ্তাহজুড়ে কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এদের মাঝে রোহিঙ্গা রয়েছেন ১৭ জন। 

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission