মশার দাপটে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী, ওষুধ ছিটানো প্রকল্প স্রেফ কাগজে

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ১১:২৫ এএম


মশার দাপটে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী, ওষুধ ছিটানো প্রকল্প স্রেফ কাগজে
ছবি: আরটিভি

লক্ষ্মীপুরে দিন দিন বেড়েই চলেছে মশার উপদ্রব। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগবালাই। মশার যন্ত্রণায় ভোগান্তিতে রয়েছে লক্ষ্মীপুর পৌরবাসী। কয়েল কিংবা স্প্রে ব্যবহার করেও মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, এমন পরিস্থিতিতে পৌর এলাকায় মশা নিধনের ওষুধ ছিটানোর কোনো ফলপ্রসূ কার্যক্রমও দেখা যাচ্ছে না। তবে প্রতিবছরই পৌরসভা মশা নিধনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম গ্রহণ করে। কিন্তু সচেতন মহলের দাবি, পৌরসভার মশা নিধন কার্যক্রম ফলপ্রসূ হয় না। লোক দেখানোভাবে কিছু স্থানে ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো হলেও পুরো প্রকল্পই থেকে যায় কাগজে-কলমে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসাধারণকে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাসহ সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল।

জানা গেছে, ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে ২৮ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনে গঠিত লক্ষ্মীপুর পৌরসভা। প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। অপরিকল্পিত বর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন বাড়ছে নাগরিক দুর্ভোগ। এর ফলশ্রুতিতে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তুপ এবং ড্রেন পরিষ্কার না করায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ড্রেনের ভেতরে জমে থাকে পলিথিন, প্লাস্টিক, বাসাবাড়ির ময়লা ও জলাবদ্ধ নোংরা পানি। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এসব স্থান হয়ে উঠছে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগবাহী মশার প্রজননক্ষেত্র। সেখানে মশার লার্ভা জন্ম নিয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। একই সঙ্গে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য অনুযায়ী জেলায় গত সাড়ে তিন বছরে ৮ হাজার ১৫৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৪৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। তবে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছে পাঁচ শতাধিক রোগী। গত দুই দিনে হাসপাতালে অর্ধশতাধিক রোগী ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে সাতজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।

পৌরবাসীর অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় প্রায় ৩৪ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। তবে কোনোটিই পরিকল্পিত নয়। এসব ড্রেনের পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি থেকেই মশার বিস্তার বেশি ঘটছে। এছাড়া প্রতিবছরই লক্ষ্মীপুর পৌরসভা থেকে মশা নিধনে ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু গত এক বছরে পৌরসভার কোথাও এর কার্যক্রম নজরে আসেনি। প্রকল্পটি কাগজ-কলমের বাইরে এসে দৃশ্যমান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।

আরও পড়ুন

সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মা বলেন, আমার মেয়ের সাত দিন জ্বর ছিল। পরে তাকে হাসপাতালে আনা হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, তার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। তার রক্তের প্লাটিলেটও কমে গেছে। এখনও সে শঙ্কামুক্ত নয়।

পৌরসভার লামচরী এলাকার ইয়াছিন মিয়া ও তারেক মাহমুদ জানান, হায়দার আলী সড়কের ড্রেন গত তিন বছরেও পরিষ্কার করা হয়নি। স্লাব ভেঙে পড়ে পানি নিষ্কাশন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ড্রেনের ভেতর জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি থেকে হাজার হাজার মশা জন্ম নিচ্ছে। কয়েল জ্বালিয়েও মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তুপ থাকলেও তা পরিষ্কারে কেউ উদ্যোগ নিচ্ছে না।

মজুপুর এলাকার মুদি দোকানি রিয়াজ হোসেন ও ওষুধ ব্যবসায়ী সোহেল হোসেন জানান, রহমতখালী খালে মানুষ ময়লা-আবর্জনা ফেলে পানি দূষিত করে ফেলেছে। এছাড়া অনেকেই বাসাবাড়ির টয়লেটের পাইপ ড্রেনে সংযুক্ত করেছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে পৌরসভার কোনো অভিযান বা তদারকি নেই। ড্রেন ও খালের পচা পানি থেকে ডেঙ্গুবাহী মশার বিস্তার ঘটছে। বছরখানেক আগে রিয়াজের স্ত্রী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এতে ৫০ ঊর্ধ্ব এই নারীকে ব্যাপক কষ্ট পেতে হয়েছে। পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। তিনি প্রায় ১৫ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সমসেরাবাদ এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন ও সরকারি কর্মচারী জাকির হোসেন জানান, আগে পৌরসভা থেকে বছরে একবার বিভিন্ন এলাকায় ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম দেখা যেত। গত দুই বছরে ওই কার্যক্রম আর দেখা যাচ্ছে না। তবে শোনা যায়, বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে পৌরসভা থেকে ওষুধ ছিটানো হয়। মনে হচ্ছে, তাদের এই কার্যক্রম শুধু সরকারি অফিসের জন্য, সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়।

ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম নিয়ে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের কাছে মশা নিধনের বরাদ্দসহ কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি নতুন এসেছি। জেনে বলতে হবে। এরপর একাধিকবার মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানতে চাইলেও ব্যস্ততার কথা বলে তিনি লাইন কেটে দেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, সারাদেশের মতো লক্ষ্মীপুরেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে এবং এ সময় মানুষ ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। ডেঙ্গুবাহী ও ম্যালেরিয়াবাহী মশা নিধনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ফগার মেশিনের মাধ্যমে স্প্রে করতে হবে। দিনে হোক বা রাতে, মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাসাবাড়ির আশপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার রাখতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে। সব মিলিয়ে নিজেও সচেতন হতে হবে, অন্যকেও সচেতন করতে হবে।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভা প্রশাসক সম্রাট খীসা বলেন, পৌরসভা থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংসের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে মশক নিধনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় সফল হব। পাশাপাশি তিনি সাধারণ জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission