মেহেরপুর জেলায় বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই বিষধর ও নির্বিষ সাপের উপদ্রব বেড়েছে। জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘরবাড়ি, উঠান, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ির আশপাশে প্রায় প্রতিদিনই সাপের দেখা মিলছে। সম্প্রতি বিষধর সাপের কামড়ে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
গত শনিবার (১১ জুলাই) দিবাগত গভীর রাতে জেলার গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রামে নিজ শয়নকক্ষে বিষধর সাপের কামড়ে জুই (১৩) নামে সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়।
একই দিন বিকেলে সাহারবাটী নীলের মাঠে জমিতে সার দিতে গেলে আইলের ওপর থাকা একটি সাপ কৃষক জিয়া উদ্দিনকে কামড়ানোর চেষ্টা করে। তবে তিনি দ্রুত পা সরিয়ে নেওয়ায় অল্পের জন্য রক্ষা পান।
সেদিন রাত প্রায় ১০টার দিকে সাহারবাটী দক্ষিণপাড়ার নুর ইসলামের বাড়িতে একটি সাপ দেখা যায়। পরে স্থানীয়রা সেটিকে মেরে ফেলেন। এর আগে শুক্রবার (১০ জুলাই) রাত ১টার দিকে একই গ্রামের মুকাদ্দেসের বাড়ির উঠানে একটি সাপ ঘোরাফেরা করতে দেখে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় সেটিকে মেরে ফেলেন।
এদিকে সোমবার (১৩ জুলাই) গাংনী উপজেলার দেবীপুর এলাকাতেও বাড়ির গেটের সামনে একটি সাপ দেখা যায়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা সেটিও মেরে ফেলেন। পরপর এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
সাহারবাটি গ্রামের বাসিন্দা সুমন আলী বলেন, জুই নামে স্কুল ছাত্রীটি মারা যাওয়ার পর থেকে পুরো গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাতে বাইরে বের হলে হাতে লাইট নিয়ে চলাফেরা করি। ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখছি, তবুও ভয় কাটছে না। প্রায়ই কোনো না কোনো বাড়িতে সাপ দেখা যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
একই গ্রামের আবু বক্কর বলেন, আমাদের এলাকায় আগে মাঝেমধ্যে সাপ দেখা যেত, কিন্তু এবার যেন অনেক বেশি। কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক বাড়িতে সাপ পাওয়া গেছে। একটি শিশুর মৃত্যুর পর মানুষ আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, এখনও অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন সাপে কাটলে কবিরাজের ঝাড়ফুঁকে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এবং সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। সাপে কাটা রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম দেওয়া গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
স্থানীয়ভাবে সাপ ধরার কাজের সঙ্গে যুক্ত রিয়াজুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে তিনি প্রায় সাড়ে ৩০০টি পদ্মগোখরা সাপ ধরেছেন। শুধু গত এক সপ্তাহেই প্রায় ১০০টি সাপ ধরেছেন বলে দাবি করেন তিনি। কোনো বাড়িতে সাপ দেখা গেলে খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে সাপ উদ্ধার করেন। প্রায় ৩২ বছর ধরে তিনি এ কাজ করছেন। তার বাবাও একই পেশায় ছিলেন এবং বাবার কাছ থেকেই তিনি সাপ ধরার কৌশল শিখেছেন।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, রাতে টর্চলাইট ব্যবহার করা এবং খালি পায়ে চলাফেরা এড়িয়ে চলা জরুরি। কোনো সাপ দেখা গেলে নিজে ধরতে বা মারতে না গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নিতে হবে। সাপে কামড় দিলে ঝাড়ফুঁক বা বিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। জনসচেতনতাই সাপের কামড়ে প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আরটিভি/এমএইচজে




