দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট। জুলাই থেকেই শুরু হয়েছে ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু ভরা মৌসুমেও এবার ইলিশের আকাল। নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়ছে না। এ সময় যেখানে ব্যবসায়ীদের ইলিশ বেচাকেনায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে পাইকারি বাজারেই ইলিশের হাহাকার চলছে। ফলে ইলিশের দামও কমছে না। ইলিশের বাড়ি হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরেও ইলিশের আকাল থাকায় দাম আকাশচুম্বী।
ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ এবং এ বিষয়ে সরকারের করণীয় নির্ধারণে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে পাঁচ সদস্যের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) একটি বিশেষজ্ঞ দল অনুসন্ধানে নেমেছে।
এদিকে সরকার ২০০৭ সাল থেকে জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির আওতায় জেলে পরিবারগুলোকে খাদ্যসহায়তা, প্রণোদনা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে আসছে। এরপরও ইলিশের উৎপাদন দিন দিন কমছে। কোনোভাবেই উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। জুলাই থেকেই শুরু হয়েছে ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ এ মৌসুমেও চাঁদপুরে তেমন ইলিশ মিলছে না। ভরা মৌসুমেও পদ্মা ও মেঘনায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ না পাওয়ায় হতাশ জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। মাছের দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারাও হতাশ হয়ে মাছ না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। অনেকে অনলাইনে ইলিশ কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এতে দুর্নামের ভাগিদার হচ্ছেন চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটের ব্যবসায়ীরাও।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্যান্য বছর এ সময়ে এই বাজারে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ কেনাবেচা হতো। এখন সেখানে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ মণ ইলিশও আসছে না। এ ছাড়া এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ আগে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও এখন সেই ইলিশের দাম সাড়ে ৩ হাজার টাকা। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়।
ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনাও কমেছে। ফলে অনেক মৎস্য ব্যবসায়ী এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। বাজারে যে অল্প পরিমাণ ইলিশ আসছে, তার দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
মাছঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী ও মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবেবরাত বলেন, চাহিদার তুলনায় মাছের সরবরাহ কম। তাই দামও বেশি। সরকার ইলিশ রক্ষায় অনেক প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু ইলিশের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ, সাগর অঞ্চল থেকে নানা কারণে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। এ ছাড়া কারেন্ট জালের ব্যবহার, নদীদূষণ এবং মেঘনা নদীর বিভিন্ন ডুবোচরের কারণেও ইলিশের সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে ইলিশের চাহিদাও ব্যাপক বেড়েছে। ফলে দাম কমছে না।
ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে সিইজিআইএসের পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে।
ড. আনিসুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম এবং বড় আকারের ইলিশের সংখ্যাও কম। তবে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। নদীর পানির গুণগত মান, স্রোত, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, মাছের চলাচলের পথসহ বিভিন্ন বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা শেষে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে একটি সুপারিশভিত্তিক প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
চাঁদপুর নদীবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় এখানে জেলের সংখ্যা বেশি। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তারা বিশেষজ্ঞ দলের কাছে অভিমত দিয়েছেন, কারেন্ট জালের ব্যবহার, নদীদূষণ এবং মেঘনা নদীর বিভিন্ন ডুবোচরের কারণে ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
আরটিভি/টিআর



