অন্তর্বর্তী আমলেও জিডিপি পরিসংখ্যানে ‘‌সি’ রেটিং পেল বাংলাদেশ

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০১:১২ পিএম


অন্তর্বর্তী আমলেও জিডিপি পরিসংখ্যানে ‘‌সি’ রেটিং পেল বাংলাদেশ
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনীতির পরিসংখ্যানে বড় ধরনের সমস্যা খুঁজে পেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ প্রেক্ষিতে গত এক দশকে বাংলাদেশের ‘উন্নয়ন’ নিয়ে যে প্রচার-প্রচারণা হয়েছে তার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় ২০২৬ সালের জানুয়ারির সর্বশেষ ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় আয় (ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস) বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দিয়েছে আইএমএফ। 

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যান, আমদানি-রফতানির পরিসংখ্যান এবং আর্থিক ও মুদ্রানীতিসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে সংস্থাটির কাছে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও পরিসংখ্যান নিয়মিত সরবরাহ করে আসছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে জিডিপি, সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যান ও ঋণ, মূল্যস্ফীতি, ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি), রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার, আর্থিক ও মুদ্রানীতিসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও পরিসংখ্যান অন্যতম। বাংলাদেশের পাঠানো এসব তথ্যের ভিত্তিতে অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে আইএমএফ। এক্ষেত্রে তথ্যের পর্যাপ্ততার বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের তথ্য-উপাত্তের গুণগত মান মূল্যায়ন করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইএমএফ।

বিজ্ঞাপন

এই প্রতিবেদনে আইএমএফ বলছে, বাংলাদেশের জিডিপি গণনায় এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি। বিশেষ করে ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল’ নিয়মিত হালনাগাদ না করায় উৎপাদনের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। জাতীয় আয়ের তথ্যে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষ করে তথ্যের সময়োপযোগিতা এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিলম্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। 

এক্ষেত্রে বার্ষিক জিডিপির পরিসংখ্যান আট মাস এবং ত্রৈমাসিক জিডিপির পরিসংখ্যান চার মাস দেরিতে প্রকাশ করা হয়। তাছাড়া, ত্রৈমাসিক জিডিপির তথ্য শুধু উৎপাদনের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়, এক্ষেত্রে ব্যয়ের ভিত্তিতে জিডিপির তথ্য দেয়া হয় না। এসব কারণে বাংলাদেশের জিডিপির পরিসংখ্যানকে ‘‌সি’ রেটিং দিয়েছে আইএমএফ, যা সংস্থাটির দ্বিতীয় সর্বনিম্ন গ্রেড।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জিডিপির সরকারি পরিসংখ্যান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও এ তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলা হয়েছে, উন্নয়নের বয়ান তৈরির জন্য জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেখানো হলেও এর প্রকৃত আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে বিগত সরকার দেশের জিডিপি পরিসংখ্যানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারও এসব পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও কাজ করেনি এ সরকারও। বরং, আগের ধারায় জিডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের বিষয়ে আইএমএফ বলছে, সিপিআই বাস্কেটে যেসব পণ্য ও সেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেগুলো অপর্যাপ্ত এবং এর কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ মূল্যায়নের বিষয়টি প্রভাবিত হতে পারে। সংস্থাটির মূল্যায়নে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান সার্বিকভাবে ‘‌বি’ রেটিং পেলেও পরিধি বা ব্যাপ্তির দিক দিয়ে ‘‌সি’ রেটিং পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত পরিসংখ্যানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চালসহ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিকভাবে বাড়ার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি হিটম্যাপ অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি হিসাবের ক্ষেত্রে চালের ভর ধরা হয় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাজারে চালের দাম বেশি থাকলেও বিবিএসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমে যায়।

মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির ঝুড়িতে ৭৪৯টি পণ্য যুক্ত করা হয়েছে। এখানে আলমারি, ল্যাপটপ, চেয়ার-টেবিল থেকে এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যা হয়তো কেউ জীবনে একবার কেনেন। আগে এতে ৪২০টি পণ্য ছিল। কিন্তু, এখন অনেক পণ্য থাকায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতিতে তেমন প্রভাব ফেলে না। যদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের হিসাবে মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করা হয়, তাহলে তা বর্তমান হারের কয়েক গুণ হয়ে যাবে।

আইএমএফের এই মূল্যায়নের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার বলেন,  বিবিএসের জনবল কম থাকার কারণে জিডিপির তথ্য প্রকাশে সময় লাগছে।

আরও পড়ুন

এছাড়া, বৈদেশিক খাতের তথ্য-উপাত্ত সামগ্রিকভাবে ‘‌বি’ রেটিং পেলেও ধারাবাহিকতার দিক দিয়ে ‘‌সি’ রেটিং দিয়েছে আইএমএফ। এক্ষেত্রে রপ্তানির তথ্য সংশোধনের কারণে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে প্রভাব পড়ার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এরর অ্যান্ড অমিশন থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

মুদ্রানীতি ও আর্থিক খাতের পরিসংখ্যানকে সার্বিকভাবে ‘‌বি’ রেটিং দিয়েছে আইএমএফ। তবে, এক্ষেত্রেও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। তথ্য প্রকাশের সময়ের ব্যবধান ও সময়োপযোগিতার দিক দিয়ে ‘‌সি’ রেটিং পেয়েছে বাংলাদেশ। 

আইএমএফ বলছে, আর্থিক খাতের পরিসংখ্যানে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য দিচ্ছে না এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা সূচকের তথ্যও দেরিতে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা শিথিল, পুনর্গঠন ও নীতিগত শিথিলতার কারণে খেলাপি ঋণ, মূলধন ও সঞ্চিতিসংক্রান্ত তথ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শ্বেতপত্রে আমরা বিবিএসের সংস্কার, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়গুলো তুলে ধরে বলেছিলাম যে এগুলো নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। কাঠামোগত পরিবর্তন করে বিবিএসের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার কথা আমরা বলেছিলাম। বিবিএসের সংস্কারের জন্য সরকার আলাদা একটি টাস্কফোর্সও করেছিল। এক্ষেত্রে শ্বেতপত্র কমিটি ও টাস্কফোর্সের সুপারিশ যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে অনেক উন্নতির সুযোগ আছে। দুঃখের বিষয় হলো এক্ষেত্রে কঠোর উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে আমরা সি-রেটিং পেয়েছি।’

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission