জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নিয়মের তোয়াক্কা না করে গভীর রাত পর্যন্ত ‘বাউল দ্রোহ’ নামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চশব্দে গান বাজানোর ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাত ১টার পরও লাগাতার সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের কারণে অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
রোববার (৩০ নভেম্বর) বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দুইটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এই গানের আসর পরিচালনা করেন বাউল ভক্ত কিছু শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ-২০১৮ এর ৫ নং ধারার 'ধ' অনুযায়ী, কোন ছাত্র/ছাত্রী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় কোন প্রকার মাইকিং, ব্যান্ডপার্টিসহ শোভাযাত্রা অথবা অনুরূপ ক্রিয়াকলাপ করতে পারবে না এবং কোন ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চাইলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এছাড়াও আবাসিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বিবেচনায় রাত ১০টার পর সব ধরনের কনসার্ট/প্রোগ্রাম নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
কিন্তু জানা যায়, নিয়মের তোয়াক্কা না করে অনুমতি ছাড়াই রাত দুইটা পর্যন্ত 'বাউল সন্ধ্যা' চালু রাখে বাউলভক্ত শিক্ষার্থীরা। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় রাত ২টা নাগাদ প্রক্টরিয়াল বডি বাউল গানের আসর নিয়মতান্ত্রিকভাবে বন্ধ করতে গেলে বাকবিতণ্ডায় জড়ান গুটিকয়েক বাউল ভক্ত শিক্ষার্থী। এ সময় শিক্ষকদের প্রতি অসম্মানসূচক আচরণ ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন তারা।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গ্রুপে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের মতামত লেখালেখি করেন।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল গালিব জাবির সকল সংবাদ ফেসবুক গ্রুপে লেখেন, যাতটুকু জানি আজকের বাউল সন্ধ্যা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও উচ্চশব্দে পুরো সময় কনসার্ট চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে এখনও। আমাদের হল থেকেই টিকতে পারছি না। অথচ পাশের লেকেই অতিথি পাখির আবাস।
তিনি আরও লেখেন, প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে নিয়মিত চিল্লানো হিপোক্রেটরাই নিজেদের প্রোগ্রামের বেলায় প্রকৃতির কথা ভুলে গেছে। প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থী হিসেবে এটার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নিয়মের তোয়াক্কা না করে এমন প্রোগ্রামে জাকসু নেতৃবৃন্দ, প্রশাসন ও সাংবাদিকরা নিরব কেন? ফাইনাল পরীক্ষার সময় নিয়মবহির্ভূত এমন প্রোগ্রাম চলতে থাকলে জাকসুর দরকার কি?
সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তানমি শাহারিন বলেন, কেমন প্রশাসন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, তা স্পষ্ট। সন্ধ্যা থেকে উচ্চশব্দ, পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে এমন হয় জানি না। ঘুমানোর জন্য দেড়ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছি না। এত সাউন্ড, এই প্রশাসনের কী কিছুই আসে যায় না? শিক্ষার্থীদের কষ্ট কী তাদের কাছে কিছুই না? আর যারা এভাবে গান বাজাচ্ছেন তারা মূলত কারা? তাদের কী কোনো সভ্যতা নেই?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফারিহা তাবাসসুম মাওয়া বলেন, আপনারা প্রোগ্রাম করতেছেন ভালো কথা কিন্তু পুরো ক্যাম্পাস কাঁপাইতেছেন কেন? ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কারণে মেয়েদের হলে রাতে টিকা যায় না। তার উপর এসব প্রোগ্রামের সাউন্ড। ম্যাক্সিমাম ডিপার্ট্মেন্টের এখন ফাইনাল চলে। পরীক্ষা দিয়ে এসে আপনাদের সাউন্ডের অত্যাচারে ঘুমাতেও পারি না। সাউন্ড সন্ত্রাস থেকে আমাদের মুক্তি দিন প্লিজ।
বাংলাদেশ ছাত্র শক্তি জাবি শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল ফেসবুকে লেখেন, বাউল আবুল সরকারকে আটকের প্রতিবাদে বাউলের দ্রোহ আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু এখন রাত ১টা ৪৮ মিনিট, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম তোয়াক্কা না করেই সন্ধ্যা থেকে উচ্চশব্দে গান বাজছে। অধিকাংশ বিভাগে পরীক্ষা চলছে। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট এবং প্রশাসনের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আয়োজনকারীরা তা মানেননি। বিষয়টি স্পষ্টভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস মাজহারুল ইসলাম ফেসবুকে লেখেন, রাত ১০টার পর অনুষ্ঠান সীমিত করার পদক্ষেপ অনেকের কাছে ষড়যন্ত্র মনে হলেও আমরা এটিকে একাডেমিক পরিবেশ রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখেছি। কিন্তু কিছু শিক্ষার্থী উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটিকে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা হিসেবে তুলে ধরছেন। যারা এসব শিক্ষার্থীবান্ধব পদক্ষেপকে ষড়যন্ত্র বলেন, তারাই এখন ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক আয়োজনের নামে চরম অরাজকতা করছেন।
তিনি আরও লেখেন, আগামিকাল থেকে প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডি যদি সর্বোচ্চ কঠোর না হন, তাহলে ‘ভিক্টিমহুড পলিটিক্স’ ক্যাম্পাসে গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে যারা সারা বছর কথা বলেন, তারাই আজকের বাউল গানের আয়োজক কমিটির সাথে যুক্ত। রাত ৯টা থেকে বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে অতিরিক্ত সাউন্ড নিয়ে ২৫–৩০টি পোস্ট হয়েছে, কিন্তু তবুও কেউ কর্ণপাত করেননি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, তবুও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন রাত ১টা ৩২ মিনিট। শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দ্রুত প্রোগ্রামটি সমাপ্ত করার আহ্বান জানাচ্ছি। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ. কে. এম রাশিদুল আলম বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে উক্ত প্রোগ্রামের কোনো অনুমতি তারা নেননি, শুধু জানিয়েছেন মাত্র। এছাড়াও উক্ত জায়গায় কোনো অনুষ্ঠান করার সুযোগ নেই, পাশেই অতিথি পাখির আবাস, তাদের উচ্চশব্দ পাখির পরিবেশ ব্যহত করেছে। বেশিরভাগ বিভাগে ফাইনাল পরীক্ষা চলে, তবুও তারা নিয়মের তোয়াক্কা না করে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা খুব শিগগিরই এটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
আরটিভি/এমএ




