জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) প্রতিদিনের পানির চাহিদা ৩৩ লাখ লিটার, ওঠানো হয় সাড়ে ৫০ লাখ। একদিনেই অপচয় ১৫ লাখ লিটারের বেশি। গবেষণা বলছে, মাত্র দুই বছরে ক্যাম্পাসে পানির স্তর গড়ে সাড়ে ৭ ফুটের বেশি (২ দশমিক ৩৩ মিটার) নিচে নেমেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাজেদা ইসলাম ও সহযোগী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান সরকারের দুটি গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ক্যাম্পাসের পাঁচটি ভূগর্ভস্থ পর্যবেক্ষণ কূপ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে সাড়ে ৫০ লাখ লিটার পানি তোলা হয়। অথচ ক্যাম্পাসের প্রকৃত চাহিদা ৩৩ লাখ লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ লিটার পানি অপচয় হচ্ছে- যা মোট উত্তোলনের ৩৫ শতাংশ।
অধ্যাপক মাজেদা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সিস্টেম লস (সরবরাহ লাইনের ত্রুটি) এবং হলের ট্যাংক উপচে পড়ার কারণেই মূলত এই বিপুল অপচয় হচ্ছে। পানির ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ভবনগুলোকে আলাদা জোনে ভাগ করা না গেলে এই অপচয় রোধ করা কঠিন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পানির স্তর এভাবে নামতে থাকলে জলাধারের হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ কমে যাবে। এতে ভবিষ্যতে ‘ভূমি অবনমন’ বা ভূমি ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা ক্যাম্পাসের ভূ-উপরিস্থ অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
গত কয়েকদিন সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম, বিজ্ঞান কারখানা ও কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন পানির লাইনগুলোতে লিকেজ রয়েছে। হলের পানির ট্যাংক ওভারফ্লো হওয়াকে ‘নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অনুপ সরকার।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কখনও কখনও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পানি পরতেই থাকে। মনে হয়, কর্মচারীরা পাম্প চালু করে দিয়ে ভুলে যান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী (সিভিল-২) আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, পাইপগুলো ১৯৭৩ সালের তৈরি। পুরোনো হওয়ায় এগুলোর পুরুত্ব কমে গেছে এবং লিকেজ হচ্ছে। ক্যাম্পাসের রাস্তার কাজ শুরু হলে পুরোনো পাইপগুলো বদলে ফেলা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ক্যাম্পাসে মাঝেমধ্যে পানির কল চুরির ঘটনা ঘটে, তখন অপচয় হয়। তবে যেসব জায়গায় লিকেজ ছিল তার বেশিরভাগই ঠিক করা হয়েছে এবং বাকিগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে।
গবেষণার তথ্য বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মীর মশাররফ হোসেন হলে পানির স্তর ২ দশমিক ৩৭ মিটার এবং মওলানা ভাসানী হলে ১ দশমিক ৯৭ মিটার নিচে নেমে গেছে। এ ছাড়া চিকিৎসাকেন্দ্র এলাকায় ২ দশমিক ৬৪ মিটার, বিশমাইল এলাকায় ২ দশমিক ৮৩ মিটার ও ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগে ১ দশমিক ৮৯ মিটার পানির স্তর নেমেছে।
কেন এভাবে পানির স্তর নামছে- এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষক মিজানুর রহমান সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, ক্যাম্পাসের নিচে থাকা ‘ডুপি টিলা’ জলাধারটি মূলত একটি আধা-আবদ্ধ বালুময় স্তর। এর ঠিক ওপরেই রয়েছে গড়ে ১০ দশমিক ৩৬ মিটার পুরু ‘মধুপুর কাদা’র আস্তরণ। এই পুরু কাদার কারণে বৃষ্টির পানি সহজে চুইয়ে ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেও প্রাকৃতিকভাবে পানির স্তর রিচার্জ বা পুনর্ভরণ হচ্ছে না। অথচ প্রতিদিনই ভূগর্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে।
সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কৃত্রিম রিচার্জ কাঠামো নির্মাণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মিজানুর রহমান সরকার বলেন, পানির স্তর একবার অতিমাত্রায় নিচে নেমে গেলে প্রাকৃতিকভাবে তা আর আগের অবস্থায় ফেরে না। এ ক্ষেত্রে আমরা কৃত্রিম পুনর্ভরণ কূপ নির্মাণ করতে পারি। বিভিন্ন ভবনের ছাদের বৃষ্টির পানি দূষণমুক্ত করে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ভূগর্ভে পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
অধ্যাপক মাজেদা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, পানি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ভবনগুলোকে আলাদাভাবে ভাগ করতে হবে। নইলে অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে না। যেমন ছুটির সময়ে ভিসি অফিসে যতটা পানির প্রয়োজন হবে, সাধারণ ভবন ও বিভাগগুলোতে ততটা পানির প্রয়োজনীয়তা না-ই থাকতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে পানির সংযোগ লাইন আলাদা করতে হবে।
আরটিভি/এমএইচজে




