১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল বিকেল পাঁচটায় উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের এক দুঃস্বপ্ন চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও আরাকান অঞ্চলকে একযোগে আঘাত করে। মাত্রা আনুমানিক ৮.৫ থেকে ৮.৮ রিখটার স্কেলে পরিমাপ হওয়া এই ভূমিকম্পে শহর থেকে পাহাড় সবই থরথর কেঁপে ওঠে। স্থানীয়রা শিউরে ওঠে সেই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা স্মরণ করে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর হ্যারি ভেরেলস্ট তার রিপোর্টে উল্লেখ করেন, শহরের সবচেয়ে মজবুত কাঠের বাংলো থেকেও মানুষের চলাফেরা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, আর ইটের বাড়িগুলো চুরমার হয়ে পড়ে। শহরের দুর্গ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী এডওয়ার্ড গালস্টোন ১৫ বার কামানের গর্জনের মতো বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। মাটির নিচ থেকে গরম গ্যাস, সালফার ও ধোঁয়ার উদগিরণ পাহাড় ফাটিয়ে আগুন বেরোতে দেখায় স্থানীয়রা আতঙ্কে ছুটে পালায়।
ভূমিকম্পের সঙ্গে সাগরে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড সুনামি, যা কক্সবাজারের বাহারছড়া অঞ্চলে এক গ্রামসহ শত শত মানুষকে অদৃশ্য করে ফেলে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্লেটের নিচে নিমজ্জনের কারণে এই ভূমিকম্প ও সুনামি ঘটেছিল। কর্ণফুলী নদীর পথও পরিবর্তিত হয়, যার ফলে বর্তমান বাংলাদেশের নদী ও ভূগোলের রূপান্তর ঘটে।

ভূমিকম্পের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরও ১১টি আফটারশক অনুভূত হয়। মানুষেরা নিরাপদ স্থানে রাত কাটায়। এই দুর্যোগ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চট্টগ্রামকে বাণিজ্যকেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনাকে বাতিল করে দেয় এবং কোম্পানি কলকাতাকে নতুন কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়, যা উপমহাদেশের ইতিহাসে বিরাট পরিবর্তন আনে।
গবেষকরা মনে করেন, এই ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি সময় ৪০০–৫০০ বছর। অর্থাৎ ভবিষ্যতেও এই অঞ্চলে এরকম এক বিপর্যয় আসতে পারে।
১৭৬২ সালের সেই ভূমিকম্প শুধু একদিনের দুর্যোগ নয়। বরং হাজার বছরের ইতিহাস, ভূগোল এবং মানুষের জীবন বদলে দেওয়া এক স্মারক। পাহাড় ফেটে আগুন, সাগরের গভীরে নিমজ্জিত গ্রাম আর চুরমার শহর আজও আমাদের ভূমিকম্প ও সুনামির ভয়াবহতা মনে করিয়ে দেয়।
আরটিভি/এসকে




