প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর ধোঁয়া ওঠা যে চায়ের কাপটিতে আমরা পরম আস্থার চুমুক দিই, তার প্রতিটি উষ্ণ ফোঁটায় আসলে মিশে আছে এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো এক কান্নার নোনা জলের প্রতিচ্ছবি। যে চায়ের দুটি পাতা আর একটি কুঁড়িকে আমরা সতেজতা আর আভিজাত্যের প্রতীক ভাবি, তার জন্ম ইতিহাস আসলে কোনো মনোরম পাহাড়ের গল্প নয়, বরং তা এক রক্তভেজা খাঁচার গল্প যা এক শতাব্দী প্রাচীন এক শৃঙ্খলের উপাখ্যান।
আজ ২১ মে, বিশ্বজুড়ে যখন ধুমধাম করে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালিত হচ্ছে, ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন সুগন্ধি চায়ের উৎসব চলছে, তার ঠিক আগের দিনটিই অর্থাৎ ২০ মে ছিল এক বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাসের দিন— যেটি ঐতিহাসিক ‘চা শ্রমিক দিবস’ নামে পরিচিত।
১৯২১ সালের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন মে মাসের সকালে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ তাদের পিঠে ব্রিটিশ সাহেবদের চাবুকের দাগ আর বুকের ভেতর এক চিলতে স্বাধীন ভূমির স্বপ্ন নিয়ে চিরতরে বাগান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। নিজেদের শিকড়—বিহার, ওড়িশা কিংবা আসামের আদি ভিটায় ফিরে যাওয়ার আকুতিতে তাদের অবরুদ্ধ কণ্ঠ থেকে সেদিন মেঘের মতো গর্জে উঠেছিল একটিই স্লোগান—‘মুল্লুকে চলো’।

কিন্তু সেই ক্ষুধার্ত, জীর্ণ-শীর্ণ মানুষগুলোর স্বপ্নের কাফেলা চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে, যেখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাহেবদের নির্দেশে গোর্খা সৈন্যরা তাদের ওপর অবলীলায় বুলেট বৃষ্টি চালিয়েছিল। শত শত নিথর দেহ সেদিন ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল মেঘনার অতল পানিতে, আর সেই কাদা-মাটিতেই চিরতরে দাফন হয়ে গিয়েছিল একটি আস্ত প্রজন্মের স্বাধীনভাবে বাঁচার আকুতি।
গবেষক রজনীকান্ত দাস তার ১৯৩১ সালের ‘প্ল্যান্টেশন লেবার ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সাহেবদের লাথি, ঘুষি আর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন কীভাবে বাগানগুলোকে জীবন্ত নরক বানিয়ে রাখত, যার ফলশ্রুতিতে কেবল ১৮৯১ সালেই আসামের বাগানগুলোতে ১০৬টি বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাগান মালিকরা যেখানে ৪৫০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা লুটেছিল, সেখানে দেওয়ান চমন লালের ‘কুলি: দ্য স্টোরি অব লেবার অ্যান্ড ক্যাপিটাল ইন ইন্ডিয়া’ (১৯৩২) অনুযায়ী, যুদ্ধোত্তর মন্দার বাহানায় শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দিনে মাত্র তিন পয়সা করা হয়। এই নরককুণ্ড থেকে বাঁচতেই সুকোমল সেনের ‘হিস্ট্রি অব দ্য লেবার মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, করিমগঞ্জে রেলের টিকিট বন্ধের অমানবিক বাধা পেরিয়ে, কলকাতার মেয়র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের সহায়তায় শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের সেই মৃত্যুঘাটে এসে উপনীত হয়েছিলেন।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশ চা বোর্ডের হালনাগাদ তথ্য ও সর্বশেষ বার্ষিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশের বাগানগুলো থেকে বছরে প্রায় ৯৩.০৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হচ্ছে এবং ১৬৮টি বড় চা বাগান ও প্রায় দেড় লাখ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত শ্রমিকের হাত ধরে এই চা শিল্প দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। অথচ কতটা নির্মম এবং বিস্মৃতিপরায়ণ হলে শত বছর পার হলেও মে মাসের ২০ তারিখটিকে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজও কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।
আজ থেকে দেড়শ বছর আগে যে ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষগুলোকে মিথ্যা স্বপ্নে ভুলিয়ে এখানে আনা হয়েছিল, যারা বাঘ-সাপ আর হিংস্র জন্তুর সাথে লড়াই করে বুকের রক্তে পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করেছিলেন, যাদের তরুণ হাড়-মাংস একদিন জল-কাদা হয়ে মাটির সাথে মিশে গিয়ে এই মাইলের পর মাইল সবুজ চায়ের গালিচা বিছিয়েছিল এবং সাহেবদের রাজকীয় বিলাসী বাংলো গড়ে তুলেছিল—আজ তাদেরই নাতি-পুতিনেরা নিজেদের স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এক প্রকার বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তাঁদের ভাগ্যলিপি গিয়ে ঠেকে মাত্র ১৮৭ টাকার একটি জীর্ণ নোটে। ভাঙা চাল-আটার নামমাত্র রেশন আর 'লেবার লাইনে'র ১০ বাই ১০ ফুটের স্যাঁতসেঁতে একটি কুঁড়েঘরে পুরো পরিবার নিয়ে গাদাগাদি করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলোর জীবন আসলে সেই তাসের ঘরের মতো, যেখানে বাগান কর্তৃপক্ষের মর্জির ওপর ঝুলে থাকে তাঁদের মাথার ওপরের ছাদটুকুও। এই ১৮৭ টাকা মজুরির গাণিতিক সত্যটি বর্তমানের তীব্র মূল্যস্ফীতির বাজারে কতটা অমানবিক, তা একটু নিবিড়ভাবে অনুভব করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং বিভিন্ন স্বাধীন অর্থনৈতিক সমীক্ষার ডেটাবেজ অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন চা শ্রমিকের দৈনিক নগদ আয় মাত্র দেড় ডলারের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়ার চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। টাকার অঙ্কে ভারতের আসাম বা পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা যেখানে দৈনিক ২৫০ রুপির বেশি (বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৩৫০ টাকার সমান) নগদ মজুরি পেয়ে থাকেন, সেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দিন পার করতে হয় মাত্র ১৮৭ টাকায়। এই সামান্য টাকা পেতে একজন শ্রমিককে পুরো দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পিঠে ২০-২৫ কেজির ঝুড়ি নিয়ে চায়ের পাতা তোলার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়, যা না পারলে আবার সমানুপাতিক হারে মজুরি কাটা যায়। অথচ অতিরিক্ত পাতা তোলার জন্য (ওভারটাইম) প্রতি কেজিতে জোটে মাত্র চার থেকে পাঁচ টাকা।
বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করলে এই বাগানগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার আরও একটি ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে। সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের চা বাগানগুলোর ওপর করা বেসরকারি গবেষণা ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের সাধারণ দারিদ্র্যের হারের চেয়ে চাবাগানের পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের হার কয়েকগুণ বেশি, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি শ্রমিক পরিবার এখনো চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, অপরিসীম পরিশ্রম ও চরম পুষ্টিহীনতার কারণে এখানকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারী ও শিশু দীর্ঘস্থায়ী রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া এবং চর্মরোগে ভোগেন, অথচ বাগানের নিজস্ব ডিসপেনসারিগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসায় প্যারাসিটামল আর স্যালাইন ছাড়া উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার আলো থেকেও এই জনগোষ্ঠীকে ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত রাখা হয়েছে; সাধারণ স্কুলগুলোর দূরত্ব এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে চাবাগানের সিংহভাগ শিশুই প্রাথমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে এবং উচ্চশিক্ষার আলো পৌঁছায় মাত্র হাতেগোনা কয়েকজনের ভাগ্যে। ফলে বাগানগুলোর সিংহভাগ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ও মান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন।
তবে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে আছে তাদের আবাসন আর ভূমির এই চিরস্থায়ী অধিকারহীনতার মাঝে। ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের মূল সুরই ছিল নিজের একটু স্বাধীন ভূমি, কিন্তু আজ চার প্রজন্ম পরেও এই বিপুল সংখ্যক চা শ্রমিকের নিজের বলতে কোনো মাটির টুকরো নেই। জরাজীর্ণ যে 'লাইন ঘর' বা ছোট কুঁড়েঘরটিতে তারা মাথা গোঁজেন, তার মালিক আসলে তারা নন—তা সম্পূর্ণ বাগান কর্তৃপক্ষের সম্পত্তি।
বাগানের অলিখিত এবং অমানবিক নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো শ্রমিক বৃদ্ধ বয়সে বা পঙ্গু হয়ে কাজ করার ক্ষমতা হারান, এবং তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য যদি বাগানের দাসত্ব মেনে নিয়ে নতুন করে চায়ের পাতা তোলার খাতায় নাম না লেখায়, তবে মুহূর্তের মধ্যে তাদের সেই আজন্ম চেনা ঘর ছাড়ার নোটিশ দিয়ে দেওয়া হয়। যে মাটিতে তাদের বাবা-দাদার কবর রয়েছে, যে উঠোনে তাদের সন্তানেরা বড় হয়েছে, কাজ হারানোর সাথে সাথে সেই মাটি থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয় এক লহমায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই নির্মম ব্যবস্থাকে সমাজবিজ্ঞানীরা "Modern-day Slavery" বা আধুনিক যুগের দাসত্ব হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যা চায়ের পাতার আড়ালে এই মানুষগুলোকে একটি অন্তহীন শৃঙ্খলে বন্দি রাখতে বাধ্য করে।
অথচ এই পুরো সবুজ সাম্রাজ্যের আসল চালিকাশক্তি কিন্তু বাগানের ওই নারী শ্রমিকেরা, যাদের পিঠের ঝুড়িতে জমে ওঠে দেশের চায়ের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পাতা। যখন কোনো মা তার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে, প্রসবের ঠিক আগের দিন পর্যন্ত পিঠে ২০-২৫ কেজির ভারী ঝুড়ি চেপে মাইলের পর মাইল পাহাড় ভাঙেন, তখন আধুনিক সভ্যতার মুখ থুবড়ে পড়ে।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চায়ের কুঁড়ি তোলা এই মায়েদের ৮২ শতাংশই সন্তান জন্মদানের পর ন্যূনতম পুষ্টিকর খাবার বা চিকিৎসা পান না। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী দেশের অন্য সব প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকারের কথা বললেও, চায়ের এই মায়েরা আজও বন্দি হয়ে আছেন ব্রিটিশ আমলের সেই আদিম ‘বাগান প্রথা’র শিকলে। কেবল আইনি আর অর্থনৈতিক শোষণই নয়, এই শান্ত সবুজ পাহাড়গুলো আসলে এক একটি সংস্কৃতির নীরব সমাধিক্ষেত্র।

শত বছর আগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ডজনখানেক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, গান আর মাদলের সুর লুকিয়ে আছে এই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে। আজ খাড়িয়া, সাদ্রি, মুণ্ডারি, কুড়ুখ আর ওড়াওঁ-এর মতো ১৪টি আদিম ভাষা এই বাগানের মাটিতেই তিলে তিলে মরতে বসেছে। আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো বিশাল সব প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও, কেবল একটু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে চায়ের দেশের এই শিশুরা নিজেদের মায়ের ভাষায় দুটো বর্ণ শেখার সুযোগ পায় না; স্কুলের চার দেয়ালে তারা নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে কেবল বাংলা শিখতে বাধ্য হচ্ছে।
তাই ২০ মে-কে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া কোনো বিলাসী দাবি নয়। বরং রক্ত জল করা এই মানুষগুলোর পিঠের ঝুড়ি নামিয়ে একটু সম্মানের জীবন দেওয়া, ভিটেমাটির স্থায়ী অধিকার নিশ্চিত করা এবং হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা রক্ষা করা রাষ্ট্রের ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব।
আরটিভি/এআর




