প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোন পথে?

শফিকুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫ , ০৭:২৮ পিএম


প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের  আন্দোলন কোন পথে?

প্রত্যেক ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের দাবি থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা হতে হবে যৌক্তিক। যৌক্তিক দাবি আদায়ে আন্দোলনও নতুন কিছু নয়। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এ দেশের মানুষ বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। আন্দোলন করেছেন, করছেন। রক্ত ঝরিয়েছেন। প্রাণও দিয়েছেন অনেকে। কখনো দাবি আদায় হয়েছে; আবার কখনো হয়নি। তা-ই বলে আন্দোলন থেমে থাকেনি। আমাদের মহান স্বাধীনতাও এই আন্দোলনেরই ফসল। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলন যেন মহামারীতে রূপ নেয়। বিভিন্ন সংগঠন দাবি আদায়ে মাঠে নেমে পড়ে। অনেক সংগঠনের দাবি সরকার মেনেও নিয়েছে। আবার অনেক সংগঠন এখনো বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে। এটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এ নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু তাদের আন্দোলনের ফলে মানুষের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়- এই দায় কে নেবে? 

বিজ্ঞাপন

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় গড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে তিনটি আন্দোলন কর্মসূচি পালিত হয়। সে হিসেবে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ৯ মাসে পাঁচ শতাধিক আন্দোলন হয়েছে ঢাকা শহরে। আন্দোলনে যুক্ত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবীরা যেমন রাস্তায় দুর্ভোগ বাড়াচ্ছেন, সমান গতিতে সরকারি চাকরিজীবীরাও দফতরের ভেতরে-বাইরে আন্দোলন করে নগরবাসীর দুঃখ বাড়াচ্ছেন। ডিএমপির পক্ষ থেকে দুর্ভোগ এড়ানো এবং নিরাপত্তার স্বার্থে আন্দোলন না করতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এলাকা নির্দিষ্ট করে দফায় দফায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আন্দোলনকারীদের থামানো যাচ্ছে না। নগরবাসীকে জিম্মি করে দিনের পর দিন চলছে আন্দোলন। অন্যদিকে দিনভর মাইক ব্যবহার করে স্লোগানে মুখরিত করে তোলায় বাড়ছে শব্দ দূষণও। (সূত্র: ঢাকা মেইল। ১৯ মে, ২০২৫)। 

গত বুধবার বুয়েট শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ছিল রাজধানীর শাহবাগ। তিন দাবিতে তারা সচিবালয় অভিযুখে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। পরে তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুরনো চেহারা দেখিয়েছে পুলিশ। বেদম প্রহারের পাশাপাশি জলকামান থেকে গরম জল নিক্ষেপ করা হয়। একই সঙ্গে ব্যবহার করা হয় সাউন্ড গ্রেনেড। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুঃখ প্রকাশ করে পরিস্থিনি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। কিন্তু দাবি আদায়ে অনড় শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

তাদের দাবিগুলো হলো—

১. নবম গ্রেডে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নির্ধারিত ৩৩ শতাংশ কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। 

বিজ্ঞাপন

২. দশম গ্রেডে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য থাকা ১০০ শতাংশ কোটা বাতিল করে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

৩. বিএসসি ডিগ্রি ছাড়া কেউ ইঞ্জিনিয়ার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না, করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এখন প্রশ্ন হলো— ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পদবী কী হবে, তা কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলছেন না। দেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা কত, সেই তথ্য নেট দুনিয়া ঘুরে পেলাম না। তবে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ৮৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন। তার মানে প্রতি বছর অন্তত ৮০ হাজার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার ৮০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর বাইরে বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়। এ ছাড়া ডিপ্লোমা পাস করার পর বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং করার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিপুল সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ার বেকার থাকছেন। চাকরির বাজারে তীব্র থেকে তীব্রতর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের কম বেতনে চাকরি করতে হচ্ছে।

আবার আসি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের দাবি প্রসঙ্গে। তারা বলছেন, ডিপ্লোমাধারীরা কোনো ধরনের বিসিএস পরীক্ষা না দিয়েই এবং যাদের বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা ‘স্নাতক’ নেই- তারাও শুধু প্রমোশনের মাধ্যমে বিসিএস ক্যাডার হয়ে যাচ্ছেন। গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, রেলওয়ে, কারিগরি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরগুলোতে দশম গ্রেডের নন-ক্যাডার পোস্টে প্রবেশ করে ৫ বছর পর তারা বিসিএস ক্যাডার হয়ে যাচ্ছেন। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের প্রতি বৈষম্যের আরেকটি চিত্র হলো- অবৈধ সিনিয়রিটি প্রদান। একই বছরে বিএসসি প্রকৌশলী আগে নিয়োগ পেলেও, যদি সেই বছরের শেষের দিকে কোনো ডিপ্লোমাধারী পদোন্নতি পান, তবে পরবর্তী সব পদোন্নতির ক্ষেত্রে সেই ডিপ্লোমাধারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এটি সুস্পষ্ট বৈষম্য এবং বিএসসি প্রকৌশলীদের জুনিয়র বানিয়ে রাখার এক অন্যায় প্রচেষ্টা। 

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের হেনস্তা এবং প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের ‘অযৌক্তিক তিন দফা দাবি’র প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও ব্লকেড কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়। তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তায় অবরোধ করে রাখেন। রাতেও তাদের রাস্তায় মিছিল করতে দেখা যায়। এসময় আন্দোলনকারীরা বুয়েট ভুয়া শ্লোগান দেন। বক্তারা বলেন, স্পর্শকাতর সরকারি বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যারা কারিগরি শিক্ষা এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র ও অযৌক্তিক ৩ দফা দাবি নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় লক্ষাধিক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এবং পাঁচ লক্ষাধিক পলিটেকনিক শিক্ষার্থী আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন। তারা সাত দফা দাবি জানিয়েছেন।

দাবিগুলো হলো—

১. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সংরক্ষিত উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ সংরক্ষণ। 

২. ১৯৭৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনের আলোকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।

৩. প্রকৌশল কর্মক্ষেত্র ফিল্ড ও ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিভাজনপূর্বক ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের নিযুক্তকরণ।

৪. জাতীয় মেধার অপচয় রোধে প্রকৌশলীদের পেশা পরিবর্তন বন্ধ।

৫. আন্তর্জাতিক ইঞ্জিনিয়ারিং টিম কনসেপ্ট অনুযায়ী ১:৫ অনুপাতে সব প্রকৌশল সংস্থার জনবল কাঠামো প্রণয়ন।

৬. ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমের কারিকুলাম ইংরেজি ভার্সনে আধুনিকায়ন, সব পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক ইনস্টিটিউট, টিএসসিতে ১:১২ অনুপাতে শিক্ষক শিক্ষার্থী বিবেচনায় শিক্ষক স্বল্পতা দূরীকরণ।

৭. পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সব প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং সনদধারীদের ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই দাবিতে বুধবার বেলা ১১টায় রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনের সামনে গণজমায়েত করে বিক্ষোভ করে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ। একপর্যায়ে মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যাওয়ার পথে তাদের ধাওয়া দেয় পুলিশ। পরে গণজমায়েতে পলিটেকনিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. আখেরুজ্জামান ও সদস্যসচিব প্রকৌশলী মো. ইমাম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল যমুনায় গিয়ে স্মারকলিপি দেয়। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে তার একান্ত সচিব স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমান বলেন, শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নয়, বুয়েটের এই দাবিগুলোর সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয় এবং পিএসসি জড়িত। সবাইকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব। এদিন সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় গনি রোডের রেলভবনে সরকারের দুই উপদেষ্টার সঙ্গে ১১ শিক্ষার্থীর একটি প্রতিনিধি দল প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা আলোচনা করেন। সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে উপদেষ্টারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সেখানে ফলপ্রসূ কোনো সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছাতে পারেননি। বৃহস্পতিবার বিকালে সরকারের সঙ্গে আবারও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে তাদের। এদিকে, প্রকৌশল পেশায় বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত দাবির যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সুপারিশ প্রণয়নে কমিটি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ৮ সদস্যের এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানকে। গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রথম বৈঠকটি এরই মধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তির খাতিরে যদি ধরেই নিই- সরকার বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিল। তাহলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীরা কী বসে থাকবেন? না। তারা মাঠে নামবেন। তাদের দাবি মেনে নিলে বিএসসি শিক্ষার্থীরা মাঠে নামবেন। তাহলে সমাধানের পথ কী? আশা করব উভয় পক্ষই ছাড় দিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছাবে। কমিটির লোকজন সেই চেষ্টা করবেন। কেননা, শিক্ষার্থীদের জায়গা রাস্তা নয়, ক্যাম্পাস।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission