ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মফস্বলের মাঝে উচ্চশিক্ষার বাতিঘর

মো: শাহিদুল ইসলাম সবুজ

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০২:২১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জেলার গুলোর মধ্যে অন্যতম ময়মনসিংহ। সেই ময়মনসিংহের মধ্যে অন্যতম উপজেলার নাম ত্রিশাল। এই ত্রিশালের মফস্বলের মাঝেই গড়ে উঠেছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ত্রিশালের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ পেরিয়ে যখন সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যায়, তখন সূর্যের আলো এসে পড়ে সবুজে মোড়ানো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারপাশে ধানক্ষেত, দূরে গ্রামীণ পথ, মাঝখানে তরুণদের স্বপ্নে ভরা এক ক্যাম্পাস এ যেন গ্রামবাংলার বুকেই দাঁড়িয়ে থাকা জ্ঞানের এক আলোকস্তম্ভ।

শহরের কোলাহল ও যানবাহনের শব্দ থেকে দূরে, মফস্বলের শান্ত পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর আশা, সংগ্রাম, ভালোবাসা আর স্বপ্নের ঠিকানা। এখানে দিনের শুরু হয় পাখির কিচিরমিচির শব্দে আর শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পদচারণায়। কেউ ক্লাসে ছুটছে, কেউ লাইব্রেরিতে বসে পড়ছে, কেউবা সবুজ ঘাসে কিংবা হলের রুমে বসে বন্ধুর সঙ্গে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে।

প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও আদর্শ

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম। বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ, তাঁর চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ক্যাম্পাসজুড়ে এক বিশেষ আবহ তৈরি করেছে। এখানে পড়াশোনা মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, মানে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাও তাইতো এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ও বলা হয়।

গ্রামঘেরা পরিবেশ, মনোযোগী শিক্ষা

মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয় বললেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে সুযোগ-সুবিধা কেমন? কিন্তু এই ক্যাম্পাসে এসে বোঝা যায়, প্রকৃতির নৈকট্য কখনো কখনো বড় শক্তি হয়ে ওঠে। শহরের যানজট বা শব্দদূষণ নেই, আছে প্রশান্ত পরিবেশ। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে সহজেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নেকবার কবির সাজিদ বলেন, `শহরে পড়লে হয়তো আরও সুযোগ পেতাম, কিন্তু এখানে যে শান্তি পাই, সেটা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। এখানের পরিবেশ গ্রামীণ, খরচ তুলনামূলক কম, বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি সবকিছু যেন একটু বেশি আন্তরিক।'

একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণচাঞ্চল্য

বর্তমানে বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা ও গবেষণা কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়কে একাডেমিকভাবে সমৃদ্ধ করছে।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক আয়োজন এই ক্যাম্পাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নজরুলসংগীত, আবৃত্তি, নাটক কিংবা জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান সবখানেই শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি। পবিত্র রমজান মাসে কেন্দ্রীয় ইফতার আয়োজন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ ক্যাম্পাসে একধরনের পারিবারিক বন্ধন তৈরি করে। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কও অনেকটাই ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক।

হল জীবন ও মানবিক সম্পর্ক

আবাসিক হলের জীবন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সন্ধ্যায় হলের বারান্দায় আড্ডা, পরীক্ষার আগে রাত জেগে গ্রুপ স্টাডি, কিংবা কোনো উৎসবকে ঘিরে সম্মিলিত প্রস্তুতি এসব মুহূর্তই গড়ে তোলে স্মৃতিময় এক ছাত্র জীবন। গ্রামাঞ্চলের মানুষের সঙ্গেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক নিবিড়। স্থানীয় বাজার, চায়ের দোকান কিংবা পথচলতি মানুষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সহজ যোগাযোগ একধরনের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে। এখানের গ্রামাঞ্চলের মানুষ এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ত্রিশাল ভার্সিটি কিংবা নজরুল ভার্সিটি নামেই চিনে।

চ্যালেঞ্জও আছে

তবে সবকিছুই যে নিখুঁত, তা নয়। যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিংবা আবাসন সংকট এসব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। কখনো কখনো শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যগত সমস্যা, আধুনিক চিকিৎসা, ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। শহরে যেতে হলে অনেক সময় দীর্ঘ জ্যাম পেরিয়ে যেতে হয়।

তবুও সীমাবদ্ধতার মাঝেও এগিয়ে চলার চেষ্টা থেমে নেই। প্রশাসনের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিচ্ছে।

সম্ভাবনার দিগন্ত

মফস্বলের এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ শুধু একটি আঞ্চলিক শিক্ষাকেন্দ্র নয়, এটি রাজধানী ঢাকা থেকে কাছে হওয়ায় উচ্চশিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। গবেষণা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি আরও বৃহৎ পরিসরে ভূমিকা রাখবে এমন প্রত্যাশা সবার।

সবুজে ঘেরা, সরলতায় ভরা এই ক্যাম্পাস যেন প্রমাণ করে উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা জ্বালাতে সবসময় বড় শহরের প্রয়োজন হয় না। কখনো গ্রামবাংলার নীরব প্রকৃতিও হয়ে উঠতে পারে জ্ঞানের উজ্জ্বল বাতিঘর। তাইতো এখান থেকেই প্রতি বছর কেও বিসিএস, বিজিএস, বার কাউন্সিল, শিক্ষকতা সহ অন্যান্য চাকরী পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে ভালো করছে।

মফস্বলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক স্বপ্নের নাম যেখানে গ্রাম আর জ্ঞান হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলছে আগামীর পথে।

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রশাসনের ভাবনা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এর উন্নয়ন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল এবং প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁরও অবদান রয়েছে।

তিনি বলেন, 'বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরামের ছোট্ট একটি ঘর থেকে শুরু করে আজ বিশ্ববিদ্যালয় এই অবস্থানে এসেছে। যখনই এখানে আসি, মনে হয় কী থেকে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে এই প্রতিষ্ঠান।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কে নিয়ে এসে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করানো হয়েছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্যাম্পাসে ফিরে এসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের প্রশংসা করেন এবং বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখানকার পরিবেশ আরও সুন্দর ও স্বতন্ত্র, যা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

তবে উন্নয়নের পথে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম, ভবনগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব নেই, সবুজায়নের অভাব রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তনও তুলনামূলকভাবে ছোট এমন বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, জনাব তারেক রহমান এর নেতৃত্বে নতুন সরকারের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও মানসম্মত ও আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, `গত ১৭ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। বাজেট ও জনবল সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।' তবে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর সন্তান জনাব তারেক রহমান জাতীয় কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিশেষ নজর দেবেন।'

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যাল

আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
একটি লং মার্চ। বিশাল মানুষের অংশগ্রহণ। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, স্লোগান সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ছে, তা হলো বড় কোনো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অযাচিত বাধার অভিযোগ নেই।
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের
কিছু রাত কেবল রাত নয়। সময়ের শরীরে তারা কোনো অদৃশ্য চিহ্নের মতো থেকে যায়। কোনো কোনো রাত আবার মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন তার অন্ধকারের মধ্যেও একটি অনাগত আলোর শব্দ শোনা যায়। জন্মাষ্টমীর রাত তেমনই এক রাত।
যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের
সাক্ষাৎকার / রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে : জেট্রো
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে জাপানি কোম্পানিগুলো। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা। কাতাওকা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা জাপানি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জেট্রোর ২০২৫ অর্থবছরের ‘বিদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি’ শীর্ষক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে কাতাওকা বলেন, বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ ‘অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে’ বিনিয়োগের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা যে জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি জানান। কাতাওকা বলেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কোম্পানিগুলোকে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিকে সহজ করে দেয়। সম্প্রতি টোকিওতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয় এবং সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর বেড়েছে বলেও জানান তিনি। কাতাওকা বলেন, আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়ায় অনেক কোম্পানি বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা ও ব্যবসায়িক সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করছে। এই প্রবণতা বাড়ার পেছনে এটিও একটি কারণ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ বেড়ে যাবে,এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে করব্যবস্থা ও শুল্ক ছাড়করণ, লাইসেন্স ও অনুমতি প্রদান এবং আইন ও বিধিবিধানের স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশ ও জাপানের ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে কাতাওকা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও শক্তিশালী বাণিজ্য ও বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারিত্বে উন্নীত করতে হবে। কাতাওকা বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু জাপান থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমরা বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জাপানে বিনিয়োগকেও স্বাগত জানাব। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে শুধু একমুখী বিনিয়োগ উৎসাহিত করাই যথেষ্ট নয়। উভয় দেশের কোম্পানির বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেন বাড়াতে হবে এবং এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজারের প্রতি, বিশেষ করে ঢাকাকে কেন্দ্র করে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান কাতাওকা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৬ শতাংশের অবদান ঢাকার। অন্যদিকে রাজধানীতে মাথাপিছু আয় ৫ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজারের পাশাপাশি ঢাকায় আয় বাড়তে থাকায় রাজধানী ক্রমেই একটি আকর্ষণীয় ভোক্তা বাজারে পরিণত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কাতাওকা বলেন, ঢাকায় উন্নত মান ও সেবার ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। এটি মানসম্মত পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্কহার থাকায় আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। কাতাওকা বলেন, এর ফলে কিছু জাপানি কোম্পানি শুধু রপ্তানির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের কথা ভাবছে না, বরং স্থানীয় উৎপাদন ও স্থানীয়ভাবে পণ্য সংগ্রহের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের বিষয়টি বিবেচনা করছে।  দেশীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা এবং স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনার সমন্বয় আগামী বছরগুলোতে জাপানি বিনিয়োগের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন কাতাওকা। তবে বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও পুনরায় উল্লেখ করেন তিনি। সূত্র: বাসস আরটিভি/এসকে
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে : জেট্রো
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা: কলেজশিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ
মাধ্যমিকের শিক্ষকদের জন্য মাউশির জরুরি নির্দেশনা
৫৯ বছর বয়সে গ্র্যাজুয়েট হলেন সেই বেলায়েত শেখ
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ, বছরে মিলবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা