বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—সঠিক সময়ে সঠিক নেতৃত্ব জাতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দিয়েছিল স্বাধীনতা। শহীদ জিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা ও যুদ্ধের নেতৃত্ব ও যুদ্ধোত্তর দুরবস্থায় জাতিকে দিয়েছিল সঠিক দিকনির্দেশনা। ১৯৯০ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচার বিরোধী সফল আন্দোলন দিয়েছিল গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত। সর্বশেষ ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সফল ও সার্থক নেতৃত্বে ছিলেন জনাব তারেক রহমান। এভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি সফলতার সাথে জিয়া পরিবারের সুযোগ্য নেতৃত্ব জড়িত।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী একুশ শতকের বাংলাদেশ আবারও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ; অন্যদিকে আছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের সংকট। এই অবস্থায় প্রশ্নগণতান্ত্রিক বাংলাদেশে—কার নেতৃত্বে নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তে পৌঁছাবে? কে তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাবে? কে নারীর অগ্রযাত্রাকে উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তরে সর্বমহল থেকে একটি নাম উঠে আসে তিনি বাংলাদেশের আগামীর প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তারেক রহমানকে অনেকে কেবল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দেখেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ও প্রজন্ম কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শুধু একটি দলের নয়, বরং জাতির সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর গবেষণা নির্ভর অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য যোগ্য করে তুলেছে।
জনসংখ্যার শক্তি ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা : বাংলাদেশ আজ জনসংখ্যাগতভাবে এক অনন্য অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশই কর্মক্ষম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বলছে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে তরুণ শ্রমশক্তির আকার পৌঁছাবে প্রায় ৮ কোটি মানুষের ঘরে। অর্থাৎ এদেশে এমন এক বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে, যারা সঠিক দক্ষতা ও সুযোগ পেলে দেশের অর্থনীতিকে বহুগুণ বাড়াতে পারবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রায় ১০-১২ শতাংশ তরুণ এখনো পূর্ণ বেকার। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স (BBS) জানাচ্ছে, বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ১০ হাজার (২০২৩ অনুযায়ী), যার বড় অংশই তরুণ।
তবে বিগত দিনে সরকার বেকারের যে হিসাব দেয়, তা প্রায় অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে।
১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৭ লাখ বেকার, তা কেউ মানবেন না; কিন্তু বেকারের সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে এটাই সত্য। কিন্তু দেশে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ মনমতো কাজ পান না। তারা পড়াশোনা করেন না, কাজেও নেই। তাঁরা ছদ্মবেকার। কোনো রকম জীবনধারণের জন্য কাজ করেন।
এই অব্যবহৃত শক্তি জাতির জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং বোঝায় পরিণত হতে পারে। কাজেই প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব, যে নেতৃত্ব তরুণদের শুধু ভোটার হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখবে।
তারেক রহমান বারবার বলেছেন, তরুণদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি প্রণোদনা, সহজ ঋণ, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তোলা হলে বাংলাদেশও পরিণত হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে। ভারতের বেঙ্গালুরু বা ভিয়েতনামের হ্যানয় আজ স্টার্টআপ হাব হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশের তরুণদেরও সে সামর্থ্য আছে। যদি সঠিক নেতৃত্ব তাদের পাশে থাকে তারা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবে।
নারীর অংশগ্রহণ ও অর্থনীতির নতুন দিগন্ত : বাংলাদেশে নারীর ভূমিকা এখন আর কেবল ঘরোয়া সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের পোশাক শিল্পে নারীর অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে, যদি এই হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তবে বাংলাদেশের জিডিপি এক দশকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।
নারীর ক্ষমতায়ন কেবল সামাজিক ন্যায়বিচার নয়, এটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা রুয়ান্ডার মতো দেশগুলো দেখিয়ে দিয়েছে—নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ভিয়েতনামে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৭২ শতাংশ, আর রুয়ান্ডার সংসদে ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী সদস্য। ফলে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন একসাথে ঘটছে।
তারেক রহমান নারীর ক্ষমতায়নে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, নারীদের শুধু কর্মসংস্থানে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। নারী যদি প্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, আর্থিক খাত কিংবা রপ্তানি বাণিজ্যে সমানভাবে অংশ নেয়, তাহলে পরিবার থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতি পর্যন্ত সমৃদ্ধ হবে। তিনি চান নারীরা রাজনৈতিক নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিক।
অর্থনীতির বহুমুখীকরণে কৃষি ও প্রযুক্তি : বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশক গার্মেন্টস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও প্রতিযোগিতা এ খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এজন্য অর্থনীতির বহুমুখীকরণ অপরিহার্য।
প্রথমত, কৃষিকে আধুনিকীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশ এখনো একটি কৃষিভিত্তিক দেশ। প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে কৃষিকে রপ্তানি খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। নেদারল্যান্ডসের মতো ছোট দেশও কেবল প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
দ্বিতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি খাত। বর্তমানে আইসিটি খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার। ভারতের আইটি খাত বছরে আয় করছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ যদি সঠিক বিনিয়োগ ও নীতি গ্রহণ করে, তবে এ খাত এক দশকে ২০ বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করতে পারে। তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সুস্পষ্ট—বাংলাদেশকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ব্লকচেইন, সাইবার সিকিউরিটি—এসব খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রবাসী অর্থনীতি। বাংলাদেশি প্রবাসীরা প্রতিবছর প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়। কিন্তু এর বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক পথে চলে যায়। দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা গেলে, এই আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। ফিলিপাইনের মতো দেশ প্রবাসী শ্রমিককে “অর্থনৈতিক নায়ক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশেও একই মডেল প্রয়োগ করা যেতে পারে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কখনোই সম্ভব নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তোলেন—বাংলাদেশে আইনের শাসন আছে কি না, ব্যবসার পরিবেশ কতটা নিরাপদ। দুর্নীতি, দলীয়করণ, বিচারহীনতা—এসব অর্থনীতিকে ধ্বংস করে।
তারেক রহমান গণতন্ত্র ও সুশাসনের গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই নয়। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান কিংবা মালয়েশিয়ার উন্নয়ন প্রমাণ করেছে—গণতন্ত্র ও সুশাসন উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত : বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে হলে আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়া : ১৯৬০-এর দশকে দারিদ্র্যপীড়িত দেশ ছিল। দক্ষ নেতৃত্ব, প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পায়ন ও শিক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমে আজ বিশ্বের ১০ বৃহত্তম অর্থনীতির একটি।
ভিয়েতনাম : ১৯৯০-এর দশকে বাজার খোলার পর কৃষি ও শিল্পে বৈচিত্র্য এনে আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি।
মালয়েশিয়া : পাম অয়েল, ইলেকট্রনিক্স ও ট্যুরিজমে বৈচিত্র্য এনে মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসছে।
রুয়ান্ডা : গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে নারী নেতৃত্ব ও প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে আফ্রিকার মডেল দেশে পরিণত হয়েছে।
এই প্রতিটি দেশ প্রমাণ করেছে—দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে এবং তরুণ-নারীকে সঙ্গে নিলে, অল্প সময়েই জাতির রূপান্তর সম্ভব।
আগামীর বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি :
তারেক রহমান কেবল তাত্ত্বিকভাবে নয়, বাস্তবতার আলোকে আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা দিয়েছেন। তাঁর দর্শনে আছে:
◑ বহুমুখী অর্থনীতি।
◑ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প।
◑ কৃষির আধুনিকীকরণ।
◑ নারী উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
◑ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন।
◑ প্রবাসী শ্রমিককে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার।
◑ সুশাসন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ।
এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৫ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের কাতারে পৌঁছাতে পারবে—যেমনটি PwC ও HSBC এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা, আবার আছে নানা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সাহসী, দূরদর্শী ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব। তারেক রহমান সেই নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি জানেন—বাংলাদেশের শক্তি তার তরুণ প্রজন্ম, তার নারীরা, তার প্রবাসীরা। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে তিনি দেখতে চান একটি সমৃদ্ধ, অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে।
আগামীর বাংলাদেশ তাই কেবল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে না, এটি হবে এক নতুন সামাজিক চুক্তির বাংলাদেশ—যেখানে তরুণরা হবে কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু, নারীরা হবে সমতার প্রতীক, কৃষি ও প্রযুক্তি একসাথে দেশের ভিত মজবুত করবে, আর গণতন্ত্র ও সুশাসন হবে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সঠিক নেতৃত্বই জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। আগামী দিনের বাংলাদেশে সেই নেতৃত্বের নাম জনাব তারেক রহমান।
লেখক: রাজনৈতিক, উন্নয়ন কৌশলবিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন





