ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষাঙ্গনের সমীকরণ: আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি, নাকি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা

সানজিদা জান্নাত পিংকি

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
সানজিদা জান্নাত পিংকি : ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ক্ষেত্র। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে শিক্ষাঙ্গনই ছিল পরিবর্তনের কেন্দ্র। তাই ক্যাম্পাসের রাজনীতিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তারই প্রতিফলন একসময় জাতীয় রাজনীতিতে দেখা যায়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে দেশের শিক্ষাঙ্গনে যে চিত্র দেখা গেল, তা আশাব্যঞ্জক নয়। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতীক হয়ে ওঠা ক্যাম্পাসগুলোতেই আবার সংঘর্ষের রাজনীতি ফিরে এসেছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আহতের সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ জনের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা শিক্ষাঙ্গনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনই ঘটায়নি, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশাও তৈরি করেছিল। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সহিংসতার পরিবর্তে সহাবস্থান, দখলদারিত্বের পরিবর্তে অংশগ্রহণ এবং দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু দুই বছর না পেরোতেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আরও পড়ুন

আগস্টের শুরুতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। বিভিন্ন ঘটনায় আহত হন বহু শিক্ষার্থী। প্রতিটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টালেও ক্যাম্পাসে সংঘাতের সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে এই ঘটনাগুলোকে কেবল দুটি ছাত্রসংগঠনের বিরোধ হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়াল হয়ে যায়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কেন শিক্ষাঙ্গনে আবারও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি ফিরে আসছে?

উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি শুধু আধিপত্যের বাহক বদলায়, কিন্তু আধিপত্যের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মূল লক্ষ্যই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, ছাত্রসংসদ কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে যদি আবারও শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তার প্রভাব শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ চরিত্রকেও প্রভাবিত করবে।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত একক আধিপত্যের একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল। সেই বাস্তবতা ভেঙে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন শক্তিগুলো নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য ছাত্রসংগঠন সবাই নতুন রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক নয়। বরং বহুমতের উপস্থিতিই একটি উন্মুক্ত ক্যাম্পাসের লক্ষণ।

কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা আর আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এক বিষয় নয়। যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্তি, নির্বাচন, সাংগঠনিক দক্ষতা ও শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের বদলে পেশিশক্তি, ভয়ভীতি কিংবা সংঘর্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক থাকে না। তখন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও পড়ুন

এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। আওয়ামী লীগ-পরবর্তী সময়ে ছাত্ররাজনীতির প্রতিযোগিতা নতুন রূপ পেয়েছে। আগে যে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যেও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। এটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক লক্ষ্যণ হতে পারে। তবে সেই পুনর্বিন্যাস কোন পথে এগোবে–সহাবস্থানের পথে, নাকি আধিপত্যের পথে? সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংঘাত আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের ছাত্রসংগঠনকে এমন বার্তা দেওয়া যে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি নেতৃত্ব, যুক্তিবোধ ও গণতান্ত্রিক চর্চার বিদ্যালয়।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকের শিক্ষার্থীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তথ্যনির্ভর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা শুধু দলীয় পরিচয় দেখে নয়; নেতৃত্বের আচরণ, জবাবদিহি, সহিষ্ণুতা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করে। ফলে যে ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, আবাসন, গবেষণা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, দীর্ঘমেয়াদে তার গ্রহণযোগ্যতাই বাড়বে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে আধিপত্যের সংস্কৃতি নতুন নয়। কিন্তু ইতিহাস এটাও বলে, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈধতা কখনো কেবল শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তা গড়ে ওঠে আস্থা, অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক আচরণের ভিত্তিতে। সেই কারণে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো সংগঠন কতটি হল নিয়ন্ত্রণ করছে বা কতটি ক্যাম্পাসে প্রভাব বাড়াচ্ছে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, শিক্ষাঙ্গনে কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রক্ষমতার অনুশীলনের ক্ষেত্র হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার স্বাধীন চিন্তা, বিতর্ক, গবেষণা এবং ভিন্নমতকে ধারণ করার ক্ষমতায়। সেই পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতি কোনো একক ছাত্রসংগঠনের নয়; ক্ষতি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের।

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করবে। কিন্তু যদি কেবল আধিপত্যের বাহক বদলায়, আর আধিপত্যের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যাবে। ২০২৪ সালের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের সামনে একটি নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তার একটি বড় পরীক্ষা এখন শিক্ষাঙ্গনেই। বিশ্ববিদ্যালয় কি আবার সংঘর্ষ, প্রতিশোধ ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির কাছে ফিরে যাবে, নাকি ভিন্নমতের সহাবস্থান, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও শিক্ষানবিশ আইনজীবি

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
জামায়াত ‘ইসলামকে’ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে: রাশেদ খাঁন
নতুন সমীকরণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন
রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে পদোন্নতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
মন্ত্রিত্ব ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হলেন জহির উদ্দিন স্বপন