শিক্ষাঙ্গনের নতুন সমীকরণ: আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি, নাকি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা

সানজিদা জান্নাত পিংকি 

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬ , ০৬:০৪ পিএম


শিক্ষাঙ্গনের সমীকরণ: আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি, নাকি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা
সানজিদা জান্নাত পিংকি : ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ক্ষেত্র। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে শিক্ষাঙ্গনই ছিল পরিবর্তনের কেন্দ্র। তাই ক্যাম্পাসের রাজনীতিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তারই প্রতিফলন একসময় জাতীয় রাজনীতিতে দেখা যায়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে দেশের শিক্ষাঙ্গনে যে চিত্র দেখা গেল, তা আশাব্যঞ্জক নয়। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতীক হয়ে ওঠা ক্যাম্পাসগুলোতেই আবার সংঘর্ষের রাজনীতি ফিরে এসেছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আহতের সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ জনের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা শিক্ষাঙ্গনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনই ঘটায়নি, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশাও তৈরি করেছিল। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সহিংসতার পরিবর্তে সহাবস্থান, দখলদারিত্বের পরিবর্তে অংশগ্রহণ এবং দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু দুই বছর না পেরোতেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আরও পড়ুন

আগস্টের শুরুতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। বিভিন্ন ঘটনায় আহত হন বহু শিক্ষার্থী। প্রতিটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টালেও ক্যাম্পাসে সংঘাতের সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে এই ঘটনাগুলোকে কেবল দুটি ছাত্রসংগঠনের বিরোধ হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়াল হয়ে যায়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কেন শিক্ষাঙ্গনে আবারও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি ফিরে আসছে?

উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি শুধু আধিপত্যের বাহক বদলায়, কিন্তু আধিপত্যের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মূল লক্ষ্যই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, ছাত্রসংসদ কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে যদি আবারও শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তার প্রভাব শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ চরিত্রকেও প্রভাবিত করবে।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত একক আধিপত্যের একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল। সেই বাস্তবতা ভেঙে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন শক্তিগুলো নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য ছাত্রসংগঠন সবাই নতুন রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক নয়। বরং বহুমতের উপস্থিতিই একটি উন্মুক্ত ক্যাম্পাসের লক্ষণ।

কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা আর আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এক বিষয় নয়। যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্তি, নির্বাচন, সাংগঠনিক দক্ষতা ও শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের বদলে পেশিশক্তি, ভয়ভীতি কিংবা সংঘর্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক থাকে না। তখন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও পড়ুন

এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। আওয়ামী লীগ-পরবর্তী সময়ে ছাত্ররাজনীতির প্রতিযোগিতা নতুন রূপ পেয়েছে। আগে যে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যেও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। এটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক লক্ষ্যণ হতে পারে। তবে সেই পুনর্বিন্যাস কোন পথে এগোবে–সহাবস্থানের পথে, নাকি আধিপত্যের পথে? সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংঘাত আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের ছাত্রসংগঠনকে এমন বার্তা দেওয়া যে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি নেতৃত্ব, যুক্তিবোধ ও গণতান্ত্রিক চর্চার বিদ্যালয়।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজকের শিক্ষার্থীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তথ্যনির্ভর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা শুধু দলীয় পরিচয় দেখে নয়; নেতৃত্বের আচরণ, জবাবদিহি, সহিষ্ণুতা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করে। ফলে যে ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, আবাসন, গবেষণা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, দীর্ঘমেয়াদে তার গ্রহণযোগ্যতাই বাড়বে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে আধিপত্যের সংস্কৃতি নতুন নয়। কিন্তু ইতিহাস এটাও বলে, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈধতা কখনো কেবল শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তা গড়ে ওঠে আস্থা, অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক আচরণের ভিত্তিতে। সেই কারণে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো সংগঠন কতটি হল নিয়ন্ত্রণ করছে বা কতটি ক্যাম্পাসে প্রভাব বাড়াচ্ছে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, শিক্ষাঙ্গনে কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রক্ষমতার অনুশীলনের ক্ষেত্র হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার স্বাধীন চিন্তা, বিতর্ক, গবেষণা এবং ভিন্নমতকে ধারণ করার ক্ষমতায়। সেই পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতি কোনো একক ছাত্রসংগঠনের নয়; ক্ষতি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের।

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করবে। কিন্তু যদি কেবল আধিপত্যের বাহক বদলায়, আর আধিপত্যের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যাবে। ২০২৪ সালের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের সামনে একটি নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তার একটি বড় পরীক্ষা এখন শিক্ষাঙ্গনেই। বিশ্ববিদ্যালয় কি আবার সংঘর্ষ, প্রতিশোধ ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির কাছে ফিরে যাবে, নাকি ভিন্নমতের সহাবস্থান, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও শিক্ষানবিশ আইনজীবি 

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission