ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য এখন নাগরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। একটি মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর কিংবা জন্মতারিখ, এখন আর কেবল তথ্য নয়; এগুলোই একজন নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয়। ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে পাসপোর্ট, মোবাইল ব্যাংকিং, চিকিৎসাসেবা, কর পরিশোধ কিংবা সরকারি ভাতা, সবকিছুই আজ ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সুশাসনের অপরিহার্য শর্ত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে ব্যক্তির বাসস্থান, যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এই গোপনীয়তার পরিধি শুধু চিঠিপত্র বা বাসস্থানে সীমাবদ্ধ নেই; এখন নাগরিকের মোবাইল নম্বর, বায়োমেট্রিক তথ্য, অবস্থান, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং অনলাইন কার্যক্রমও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অংশ। ফলে আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৩ সালে, যখন সরকারি একটি ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে প্রায় পাঁচ কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানাসহ নানা সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছিলো। দেশি-বিদেশি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডেটা লিকের একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। তদন্ত, ব্যাখ্যা ও আশ্বাস দেওয়া হলেও ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডারের একটি দুর্বলতাই কোটি মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
শুধু এনআইডির তথ্য ফাঁসই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সাইবার প্রতারণার ধরনও দ্রুত বদলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশের সাইবার ইউনিট এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সতর্কবার্তায় নিয়মিতই উঠে আসছে ফিশিং লিংক, ভুয়া কাস্টমার কেয়ার, কিউআর কোড প্রতারণা, সিম সোয়াপিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখল এবং মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতির ঘটনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুয়া কণ্ঠস্বর বা ছবি তৈরি করে প্রতারণার ঘটনাও বিশ্বজুড়ে বাড়ছে।
ডিপফেক ভিডিও, ভয়েস ক্লোনিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর পরিচয় জালিয়াতি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব অপরাধের অন্যতম ভিত্তি ব্যক্তিগত তথ্যের অনিয়ন্ত্রিত প্রাপ্যতা।
এরপরও উদ্বেগ কমেনি। প্রায়ই দেখা যায়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে প্রতারণা, ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া, ভুয়া কাস্টমার কেয়ারের ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক কিংবা পরিচয় চুরির (Identity Theft) ঘটনা। প্রতারকদের অনেকের কাছেই ভুক্তভোগীর নাম, মোবাইল নম্বর, এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত তথ্য থাকে। প্রশ্ন হলো, এই তথ্যগুলো কোথা থেকে যাচ্ছে? প্রতিটি ঘটনার উৎস হয়তো এক নয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এখনও দুর্বল।
বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার পরিধি দ্রুত বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করছে। কিন্তু কোন তথ্য কেন নেওয়া হচ্ছে, কত দিন সংরক্ষণ করা হবে, কার সঙ্গে ভাগ করা যাবে, তথ্য ফাঁস হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কী প্রতিকার পাবেন, এসব বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ও কার্যকর আইনি কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘যত বেশি, তত ভালো’ এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় ঝুঁকি।
সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশে আইন রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। তবে এই আইন মূলত সাইবার অপরাধ ও শাস্তির বিষয়কে কেন্দ্র করে; ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, তথ্য ব্যবহারের সীমা, নাগরিকের সম্মতি এবং তথ্য নিয়ন্ত্রকের দায়বদ্ধতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এতে গড়ে ওঠেনি। ফলে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের অধিকার ও প্রতিকার এখনো স্পষ্ট নয়।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য দীর্ঘদিনের আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে, যা পরবর্তীতে ২০২৬ সালে সংশোধনের মাধ্যমে আরও পরিমার্জিত হয়। এর মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন, শক্তিশালী ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা, তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দ্রুত প্রতিকার এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআর (GDPR) কোনো প্রতিষ্ঠানকে নাগরিকের প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ দেয় না। তথ্য কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হবে, কত দিন রাখা হবে এবং নাগরিক চাইলে কীভাবে তা মুছে ফেলা হবে, এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় থাকতে হয়।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত উপাত্ত সুরক্ষা আইনেও (Data Protection Act) ইউরোপের এই GDPR-এর বেশ কিছু নীতি, যেমন ডেটা লোকালাইজেশন, ডেটা প্রসেসর ও কন্ট্রোলারের দায়বদ্ধতা অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বভাবতই, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের নীতিগত কাঠামোর কার্যকর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
তবে দায় কেবল রাষ্ট্রের নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব কম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার চেয়ে তথ্য সংগ্রহে বেশি আগ্রহী। আবার কোথাও কর্মীদের অসতর্কতা, কোথাও দুর্বল সার্ভার, কোথাও নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার অভাব তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্যকে অনেক সময় সম্পদের পরিবর্তে দায় হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অথচ একবার তথ্য ফাঁস হলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, ওটিপি বা ব্যাংকিং তথ্য কাউকে না দেওয়া, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখা এখন আর বিলাসিতা নয়; এগুলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ন্যূনতম শর্ত।
ডিজিটাল রাষ্ট্র গড়তে হলে নাগরিকের আস্থা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই আস্থা কেবল নতুন অ্যাপ, স্মার্ট সেবা বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দিয়ে তৈরি হবে না; তৈরি হবে তখনই, যখন মানুষ নিশ্চিত হবে যে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান তার ব্যক্তিগত তথ্যের বিশ্বস্ত অভিভাবক।
প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের তথ্য ফাঁসের ঘটনা আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে, ডিজিটাল অবকাঠামো যত দ্রুত বিস্তৃত হবে, তথ্য সুরক্ষার আইন ও জবাবদিহিও তত শক্তিশালী হতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির সুবিধা যত বাড়বে, নাগরিকের ঝুঁকিও তত বাড়বে।
ডিজিটাল অগ্রগতির এই সময়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, আস্থা। আর সেই আস্থার ভিত্তি হতে পারে একটি আধুনিক, কার্যকর ও নাগরিককেন্দ্রিক ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক তথ্য ব্যবস্থাপনা। ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে কি না, তার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রস্তুতির ওপর।
লেখক : সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী
আরটিভি/এমএম


