সম্প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের একটি আগাম সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদটি প্রত্যাশিত বিভিন্ন কারণে।
প্রথমতঃ এর মাধ্যমে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা আমলের লিগাসির একটা প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়তঃ এই ঘটনা বর্তমান সরকারের জন্য আগামী দিনগুলোতে একটি দুশ্চিন্তামুক্ত ও স্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
বর্তমান বিএনপি সরকার এই রাষ্ট্রপতিকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছেন এবং তার জন্য একটি সম্মানজনক প্রস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, বিএনপি এ জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। চুপ্পু সাহেব মানুষ হিসাবে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় যাই হোন না কেন, তিনি যে দেশের রাষ্ট্রপতি— বিএনপি অন্যান্য দলগুলোরমতো সেকথাটি ভুলে যায়নি।
তৃতীয়তঃ এরফলে সরকার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়কালে একজন নির্ভরযোগ্য মানুষকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে এই পদে নিয়োগের জন্য যে ধরনের মানুষদের নিয়োগের কথা প্রচারিত হচ্ছে, তা অনেকের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী সরকার এই পদে একজন শীর্ষ আমলাকে নিয়োগের কথা বিবেচনা করছে বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি খুব নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ একই ধরনের কাজ গত সরকারও করেছে এবং তা খুব একটা বিবেচনাপ্রসূত হয়েছিল বলে কেউ মনে করছে না। তাছাড়া আলোচনায় থাকা এই আমলা গত সরকারের সময় কোন বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন, তাও নিশ্চিত না। ফলে, সরকার এই পথে হাঁটবে বলে মনে করি না।
অপর একটি সূত্র বলছে যে সরকার এই পদে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন নারীকে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করছে, যিনি একজন দ্বৈত নাগরিক। বস্তুতঃ আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতিও একজন দ্বৈত নাগরিক। এছাড়াও গত সরকারের আমলে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরও দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। এতে সেই মানুষগুলোর এই দেশের প্রতি কোন দায়বদ্ধতার কারণ যেমন ছিল না, তেমনি তাদের কার্যকলাপেও কোন দেশপ্রেমিকের লক্ষণ দেখা যায়নি।
যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তারা তাদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যই যে তা করেছেন, সে কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। তাছাড়া দেশের এই ধরনের সম্মানজনক পদগুলোতে যদি বিদেশি নাগরিকরা নিয়োগ লাভ করতে থাকেন, তাহলে দেশের একনিষ্ঠ নাগরিকেরা বঞ্চিত ও প্রতারিত বোধ করতেই পারেন, যা বাঞ্চনীয় না। সে কারণে সরকার কোন সুযোগসন্ধানী মানুষকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার মতো বড় ভুল করবে, এরকম আমি মনে করিনা।
সরকার এক্ষেত্রে একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতাকে এই পদে নিয়োগ করলে তা সর্বাঙ্গসুন্দর হবে। যে সকল রাজনৈতিক নেতা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতি করছেন, নানা নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেছেন, লোভলালসাকে তুচ্ছ করে দলের প্রতি একনিষ্ঠভাবে আনুগত্য ধরে রেখেছেন, সেই ধরনের মানুষকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করলে বিএনপি ভালো করবে।
এর মাধ্যমে বিএনপি দু’টো বার্তা দিতে পারবে। প্রথমটি হলো বিএনপি তার আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাসী মানুষদের মূল্যায়ন করে। আর দ্বিতীয়টি হলো বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে সুযোগসন্ধানী মানুষদের জায়গা নাই। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো যে মানুষেরা ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত লাভের জন্য দেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে পারেন, তারা ভবিষ্যতে যে অন্য কোন প্রলোভনের কাছে বিক্রি হবেন না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না। বিএনপি এই ধরনের মানুষদের দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক পদের জন্য বিবেচনা করে না।
বাংলাদেশের মানুষ এই পদে একজন সৎ, যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে দেখতে পছন্দ করে। সরকারকে দেশের মানুষের সে প্রত্যাশার প্রতি সম্মান জানাতে হবে। বস্তুতঃ দেশের সাধারণ মানুষ এইসব ছোটখাটো বিষয় থেকেই আগামীর নির্বাচনে ভোট দেওয়ার বিষয়ে ধীরে ধীরে মনস্থির করতে থাকে।
বিগত দিনে বিএনপি তার দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্য থেকেই এই পদে নির্বাচিত করেছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। সেকারণে এবার এই পদে নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে আরও বেশি সাবধানতা ও বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে, অতীতের একটি ভুল যেন সামনের দিনে আরও বড় ভুলের পথে বিএনপিকে ঠেলে না দেয়, তা মাথায় রাখতে হবে।
লেখক: নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক
আরটিভি/এমএম



