বাংলাদেশ আজ দৃশ্যমান উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে; পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা আকাশচুম্বী বহুতল ভবন কী নেই! গত দুই দশকে দেশের অবকাঠামোগত পরিবর্তন এত দ্রুত হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। আধুনিক সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ডিজিটাল সেবা কিংবা নগরায়ণের বিস্তার আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আমরা একটি উন্নয়নশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের দেখতে চাই। কিন্তু এই ঝলমলে উন্নয়নের আড়ালে এমন কিছু বাস্তবতা আছে, যা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে।
সম্প্রতি টিআইবির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ২৯৪টি ছিনতাই, ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অপরাধের সংখ্যাটা আঁতকে ওঠার মতো। প্রতিদিনের সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই এসব নজরে আসে। আর প্রশ্ন জাগে- আমরা আসলে কোন সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? কেন মানুষের জীবনের মূল্য দিন দিন এত কমে যাচ্ছে? কেন একটি শিশু, একটি নারী, এমনকি নিজের পরিবারও অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়? কেন ধর্ষণ, খুন, পারিবারিক সহিংসতা, ছিনতাই কিংবা কিশোর অপরাধের ঘটনা এত ঘন ঘন ঘটছে? উন্নয়নের যে গল্প আমরা বলছি, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার ব্যবধান কোথায়?
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো মানুষের জীবনমানের উন্নতি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। একটি দেশের মানুষ যদি নিজেদের নিরাপদ মনে না করে, যদি একজন মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন, যদি একজন নারী প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিরাপত্তার হিসাব কষেন, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা পূর্ণাঙ্গ, সেই প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের অবশ্যই আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভয়াবহ অনেক অপরাধ আমাদের কাছে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রতিদিন সকালে নিউজ ফিড স্ক্রল করতে করতে আমরা খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা আত্মহত্যার খবর দেখি, কিছুক্ষণ আলোচনা করি, তারপর পরবর্তী ঘটনায় চলে যাই। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ডিসেনসিটাইজেশন’ বা সংবেদনশীলতার ক্ষয়। অর্থাৎ কোনো ঘটনা বারবার ঘটতে ঘটতে মানুষের কাছে সেটি আর অস্বাভাবিক মনে হয় না। এটি কোনো সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ। কারণ, যখন মানুষ অন্যায়ের প্রতি সংবেদনশীলতা হারাতে শুরু করে, তখন অন্যায় আরও সহজে জায়গা করে নেয়।
সিফাত, রামিসা কিংবা আছিয়ার মতো নামগুলো কেবল কয়েকজনের নাম নয়। এগুলো আজ অসংখ্য পরিবারের কান্না, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন এবং বিচার প্রত্যাশার প্রতীক। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি ভেঙে পড়া ভবিষ্যৎ, একটি মায়ের নির্ঘুম রাত। কোনো সেতু, কোনো বহুতল ভবন কিংবা কোনো অর্থনৈতিক সূচক সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। কারণ একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অন্য সব অর্জন অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা হলো, অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে নানা জটিল কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিস্তার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান এবং আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক গুরুতর অপরাধের পেছনেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান, ছিনতাই, সহিংসতা, পারিবারিক কলহ কিংবা যৌন অপরাধ ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই মাদক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
তাই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয় যে, এত সহজে মাদক কীভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়? অলিগলি, মহল্লা কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যখন মাদকের বিস্তার নিয়ে আলোচনা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহিতার প্রশ্ন সামনে আসে। অবশ্যই সমস্যাটি কেবল আইন প্রয়োগের নয়; এর সঙ্গে জড়িত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও। তবে এটাও সত্য যে, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
শুধু মাদক নয়, আমাদের সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। অনেক সময় অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। ফলে আইনের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক ও নৈতিক উন্নয়ন। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও দৃশ্যমান হবে। যেখানে অপরাধী তার পরিচয় বা প্রভাবের কারণে ছাড় পাবে না। যেখানে শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধও শেখাবে। যেখানে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে সুস্থ নাগরিক গড়ে তুলতে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রা অবশ্যই অব্যাহত থাকা উচিত। আরও সেতু হবে, আরও শিল্প হবে, আরও বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু সেই সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিতে হবে মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে। কারণ উন্নয়নের আসল লক্ষ্য কংক্রিটের কাঠামো নয়, মানুষের কল্যাণ।
আমাদের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আমরা কি শুধু দৃশ্যমান উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাইব যেখানে মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে? যেখানে একটি শিশু ভয় নয়, স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে; একজন নারী নিরাপত্তাহীনতা নয়, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে চলবে; এবং একজন নাগরিক জানবে, রাষ্ট্র তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
উন্নয়নের আলো তখনই সত্যিকারের আলো হয়ে উঠবে, যখন তার ছায়ায় কোনো অন্ধকার লুকিয়ে থাকবে না। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার। কারণ একটি নিরাপদ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প।
লেখক : মডেল
আরটিভি/এসকে




