সবুজ মাঠের আড়ালে অবৈধ অর্থের খেলা

এম এম মুসা

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫১ এএম


সবুজ মাঠের আড়ালে অবৈধ অর্থের খেলা
উন্নয়নকর্মী ও গবেষক এম এম মুসা। ছবি: আরটিভি

চার বছর পরপর সারা পৃথিবী একটি বলের পেছনে ছুটতে শুরু করে। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে, স্টেডিয়ামে গলা ফাটায়, পতাকা ওড়ায়। কিন্তু এই আবেগ আর উন্মাদনার আড়ালে চলে আরেকটি খেলা। যেখানে বল নয়, খেলা হয় শত শত কোটি ডলার নিয়ে।

ফিফা নিজেই জানিয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাদের মোট পাঁচ দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার আয়ের সত্তর শতাংশই এসেছে শুধু ২০১৪ বিশ্বকাপের সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব বিক্রি থেকে। এত বিপুল অর্থের প্রবাহ যেখানে থাকে, সেখানে দুর্নীতির হাতছানিও থাকে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মাঠের গল্পের সমান্তরালে চলেছে ঘুষ, জালিয়াতি, অর্থ পাচার আর ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেক ইতিহাস।

যেদিন ফুটবলের ‘রাজপ্রাসাদ’ কেঁপে উঠল

২০১৫ সালের ২৭ মে ভোরবেলা সুইজারল্যান্ডের জুরিখের একটি অভিজাত হোটেলে পুলিশ ঢুকে একে একে গ্রেপ্তার করে ফিফার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিন আদালতে সেদিন উন্মুক্ত করা হয় বিশাল এক অভিযোগপত্র, যেখানে চৌদ্দজন আসামির বিরুদ্ধে রেকেটিয়ারিং, তার-জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়। মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই ও করবিভাগের আয়কর তদন্ত শাখা তেত্রিশটি দেশের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বছরের পর বছর ধরে এই তদন্ত চালিয়েছিল। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে চলা এক দীর্ঘ চক্রে ফিফা, কনমেবল ও কনকাকাফের কর্মকর্তারা মিডিয়া ও বিপণন স্বত্ব বিক্রির নামে অন্তত দেড়শ মিলিয়ন ডলার ঘুষ লেনদেন করেছেন।

তৎকালীন মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল লরেটা লিঞ্চ এই কেলেঙ্কারিকে ফুটবলের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেন। কনকাকাফের সাবেক মহাসচিব চাক ব্লেজার ও সাবেক সভাপতি জ্যাক ওয়ার্নারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত দোষ স্বীকার করে নেন। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পুরো তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল নিতান্তই একটি ব্যক্তিগত আয়কর ফাঁকির অনুসন্ধান থেকে, যা ক্রমে রূপ নেয় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি উন্মোচনে।

আয়োজক নির্বাচনের নেপথ্যে অর্থের খেলা

২০১০ সালে যখন রাশিয়াকে ২০১৮ এবং কাতারকে ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক ঘোষণা করা হয়, তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে থাকে ভোট কেনার অভিযোগ নিয়ে। ফিফা নিজেই মার্কিন আইনজীবী মাইকেল গার্সিয়াকে দিয়ে একটি তদন্ত করায়, কিন্তু সেই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।

গার্সিয়া নিজেই পরে অভিযোগ করেন, প্রকাশিত সারসংক্ষেপ তাঁর প্রকৃত অনুসন্ধানকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। বছরের পর বছর চাপের মুখে থেকে শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে ফিফা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এরপর ২০১৯ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পেতে ফিফাকে আটশ আশি মিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করেছিল বলে অভিযোগ।

এর আগেই আরেকটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফিফার সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ বিন হাম্মাম কাতারের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন ফুটবল কর্মকর্তাকে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছিলেন বলে নথিপত্র পাওয়া যায়। রাশিয়া ও কাতার উভয় দেশই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং ফিফার তদন্তে তাদের সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি বলা হলেও, প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে বিডিং প্রক্রিয়ার নিয়মকানুন সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছিল।

মরুভূমিতে বিশ্বকাপ, শ্রমিকের রক্তে গড়া স্টেডিয়াম

কাতার বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আয়োজন। স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক অবকাঠামো মিলিয়ে যার পেছনে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক দুইশ বিশ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই ঝকঝকে অবকাঠামোর পেছনে রয়েছে লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের রক্ত-ঘাম আর জীবনের বিনিময়ে গড়া এক নির্মম বাস্তবতা।

ব্রিটিশ সংবাদপত্রের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পাওয়ার পর থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অন্তত সাড়ে ছয় হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে কাতারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম আর অস্বাস্থ্যকর আবাসনের কারণে এসব মৃত্যুর সিংহভাগ ঘটেছে, অথচ কাতার কর্তৃপক্ষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা প্রাকৃতিক মৃত্যু বলে নথিভুক্ত করেছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। কাফালা নামের শ্রমিক জামানত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন শ্রমিকদের চাকরি পরিবর্তন কিংবা দেশত্যাগের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রেখেছিল।

ফিফা সভাপতি নিজেই এক সংবাদ সম্মেলনে কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ দেওয়াকেও মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার নামান্তর বলে মন্তব্য করলে তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা আয়োজক নির্বাচনের সময় মানবাধিকার পরিস্থিতি যাচাইয়ের কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত না রাখাই এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

ব্রাজিলের রাজপথে ‘সবচেয়ে বড় চুরি’র প্রতিবাদ

২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ঠিক আগে দেশজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। বারো লাখেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন কনফেডারেশন্স কাপের সময়, যার মূল কারণ ছিল সরকারি অর্থে নির্মিত বিলাসবহুল স্টেডিয়াম আর দুর্নীতির অভিযোগ। বার্তা সংস্থার অনুসন্ধানে দেখা যায়, বারোটি স্টেডিয়ামের মোট নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের প্রায় চার গুণ বেড়ে চার দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ব্রাসিলিয়া শহরের স্টেডিয়াম, যেখানে কোনো বড় পেশাদার ফুটবল দলই নেই, তার নির্মাণ ব্যয় সরকারি নিরীক্ষায় প্রায় তিনগুণ বেড়ে নয়শ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন

নিরীক্ষকরা দেখতে পান, মাত্র সাড়ে চার হাজার ডলারের একটি পরিবহন কাজের বিল ধরা হয়েছিল প্রায় পনেরো লাখ ডলার, যা জালিয়াতির স্পষ্ট নমুনা। একই সময়ে দেখা যায়, স্টেডিয়াম নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক তহবিলে চাঁদার পরিমাণ পাঁচশ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, যা নির্মাণ সংস্থা আর রাজনীতিকদের মধ্যকার সুবিধাজনক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।

 ব্রাজিলের সাবেক তারকা ফুটবলার রোমারিও পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ হয়ে এই বিশ্বকাপ আয়োজনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক অন্যায়ের একটি বলে অভিহিত করেছিলেন। নির্মাণকাজ চলাকালে দুর্ঘটনায় আটজন শ্রমিকের মৃত্যুও হয়েছিল, যা নিয়ে পরে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

অর্থনীতিবিদদের চোখে: লাভ নয়, বোঝা

স্মিথ কলেজের অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু জিম্বালিস্ট বহু বছর ধরে অলিম্পিক ও বিশ্বকাপের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার আলোচিত গ্রন্থ সার্কাস ম্যাক্সিমাসে তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৬০ সালের পর থেকে প্রতিটি অলিম্পিক আয়োজনেই ব্যয় বেড়েছে গড়ে আড়াই থেকে তিন গুণেরও বেশি, আর বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও চিত্রটি প্রায় একই। তার ভাষায়, আয়োজক শহরগুলো সাধারণত টুর্নামেন্ট থেকে সরাসরি রাজস্বের ভাগ পায় না, অথচ নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ব্যয়ের পুরো বোঝা তাদেরই বহন করতে হয়।

২০২৬ বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, একটি শহরের জন্য একাই একশ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হতে পারে, অথচ আয়ের সিংহভাগ চলে যায় ফিফার কোষাগারে। জিম্বালিস্ট আরও দেখিয়েছেন, আয়োজক শহরের অর্থনৈতিক রূপান্তরের যেসব দাবি প্রচার করা হয়, বাস্তবে তার সপক্ষে দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ খুবই সীমিত। বরং বাসিন্দাদের উচ্ছেদ, পরিবেশগত ক্ষতি আর নির্মিত অব্যবহৃত স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ই থেকে যায় দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার হিসেবে।

২০২৬ বিশ্বকাপেও থামেনি পুরোনো ছায়া

উত্তর আমেরিকার তিন দেশ মিলে আয়োজিত চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপও পুরোনো সমস্যার বাইরে থাকতে পারেনি। আর্জেন্টিনার দল যখন শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটি তিনশ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, আর এ নিয়ে সংস্থার সভাপতিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

মার্কিন একটি সংবাদমাধ্যমের ভাষায়, মায়ামি শহরকে কেন্দ্র করে একটি জটিল জাল কোম্পানি আর অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা মার্কিন ব্যাংকগুলোকে অর্থের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে বিভ্রান্ত করেছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ফুটবলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতার ঘাটতি নতুন কিছু নয়; বরং প্রতিটি বিশ্বকাপের সঙ্গে তা নতুন রূপে ফিরে আসে।

শেষ কথা: বলের খেলা, নাকি অর্থের খেলা?

১৯৯১ সাল থেকে শুরু হওয়া একটি দুর্নীতি চক্র, আয়োজক নির্বাচনে ঘুষের অভিযোগ, মরুভূমির বুকে হাজারো শ্রমিকের নীরব মৃত্যু, ব্রাজিলের রাজপথে লাখো মানুষের ক্ষোভ, আর সবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন তদন্ত— এই পুরো ইতিহাস একটি বার্তাই দেয়: বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু খেলার মাঠের গল্প নয়, এটি একটি বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য, যেখানে জবাবদিহিতার অভাব বারবার সুযোগ করে দিয়েছে ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য এই বৈশ্বিক আয়োজনকে ব্যবহার করার।

ফিফা সংস্কারের কথা বলে, নতুন নিয়মকানুন করে, কিন্তু প্রতিটি নতুন বিশ্বকাপের সঙ্গেই যেন নতুন এক কেলেঙ্কারির জন্ম হয়। যতদিন না স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, ততদিন বিশ্বকাপের ঝলমলে পর্দার আড়ালে এই অবৈধ অর্থের খেলা চলতেই থাকবে, আর তার মূল্য শেষ পর্যন্ত গুনতে হবে সাধারণ করদাতা আর নিঃস্ব অভিবাসী শ্রমিকদেরই।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

আরটিভি/এসআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission