ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দুর্যোগে শিক্ষা থেমে গেলে ক্ষতি কার?

সানজিদা জান্নাত পিংকি

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম
গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) ও শিক্ষানবিস আইনজীবীর সাবেক সভাপতি সানজিদা জান্নাত পিংকি। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

দেশের দুর্যোগের ইতিহাস দীর্ঘ। বন্যা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলাবদ্ধতা, প্রায় প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, পরীক্ষা স্থগিত বা ক্লাস বাতিলের সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলা যায় না। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। দুর্যোগের কারণে শিক্ষা যখন থেমে যায়, তখন সেই ক্ষতির হিসাব কে রাখে?

এ বছরের জুলাই মাসেও সেই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন একাধিক দিনের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নিলেও এর ফলে হাজারো পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পরীক্ষার নতুন সূচি, ফল প্রকাশ এবং পরবর্তী একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবার দুর্যোগের সময় আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান দেখি। কত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে, কত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত সড়ক ডুবে গেছে, এসব তথ্য সামনে আসে। কিন্তু কত শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে পারেনি, কতজনের সেমিস্টার পিছিয়েছে, কতজনের উচ্চশিক্ষা বা চাকরির পরিকল্পনা বিলম্বিত হয়েছে, এসব নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। অথচ এগুলোও দুর্যোগের বাস্তব ক্ষতির অংশ।

শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ক্লাস মিস হওয়া বা একটি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ার প্রভাব সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সমান নয়। যে শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনের সময় ঘনিয়ে এসেছে, কিংবা যার চাকরিতে যোগদানের জন্য সনদ প্রয়োজন, তার কাছে এক মাসের বিলম্বও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। একটি পরীক্ষা স্থগিত হলে শুধু একটি তারিখ পরিবর্তন হয় না। পুরো একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রভাবিত হয়। ফল প্রকাশ পিছিয়ে যায়, পরবর্তী সেমিস্টার শুরু হতে দেরি হয়, গবেষণার সময়সূচি বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি যেমন ব্যক্তিগত ক্ষতি, তেমনি দেশের জন্যও এটি উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তুলতে হবে। শুধু দুর্যোগের সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়; শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা আগেভাগেই প্রস্তুত রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের জটিলতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও বিদ্যালয় বন্ধ ছিল, কোথাও শ্রেণিকক্ষ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, আবার কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে দুর্যোগকে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন শিক্ষা পরিকল্পনার একটি স্থায়ী বাস্তবতা।

করোনা মহামারি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা পুরোপুরি থেমে থাকেনি। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিল। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্যের বাস্তবতাও সামনে এসেছিল। অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট, স্মার্টফোন বা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। ফলে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান যথেষ্ট নয়; অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান প্রয়োজন।

দুর্যোগের সময় আরেকটি বাস্তবতা প্রায়ই সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হলেও শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত অফিস করতে হয়। প্রশাসনিক কিছু কাজের প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে যদি একটি পরিস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একই ঝুঁকির মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়াই কাম্য।

এখানে নীতিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম একাডেমিক পরিকল্পনা, নমনীয় পরীক্ষা সূচি এবং দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা চালু করার সক্ষমতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

সব অঞ্চলের জন্য একই সিদ্ধান্তও সব সময় কার্যকর হয় না। দেশের একটি অংশে বন্যা হলেও অন্য অংশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকতে পারে। তাই অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। এতে যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তেমনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিক্ষা কার্যক্রমও স্থবির হবে না।

দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবকাঠামো। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা মানবিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু একই সঙ্গে এমন পরিকল্পনাও থাকতে হবে, যাতে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পর দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা যায়। কারণ দুর্যোগ শেষ হলেও শিক্ষার ক্ষতি যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়।

আরও পড়ুন

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আজ যে শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আগামীকাল সেই শিক্ষার্থীই দেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আইনজীবী, বিচারক কিংবা প্রশাসক হবে। তার শিক্ষাজীবনের প্রতিটি অযাচিত বিলম্ব শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের গতিকেও প্রভাবিত করে।

দুর্যোগের সময় নিরাপত্তা অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে শিক্ষা পরিকল্পনাও স্থগিত থাকবে। বরং সংকটের মধ্যেও শিক্ষা কীভাবে চালিয়ে নেওয়া যায়, সেই সক্ষমতাই একটি আধুনিক ও দূরদর্শী শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতেই হবে। সেই প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। আগাম পরিকল্পনা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকল্প শিক্ষা, নমনীয় একাডেমিক ক্যালেন্ডার এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার কৌশল, এসবকে আর অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো এখন শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।

দুর্যোগে ভেঙে যাওয়া একটি সেতু পুনর্নির্মাণ করা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত একটি সড়কও একসময় মেরামত হয়। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া সময় পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সময় শিক্ষা খাতকে শুধু একটি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রশ্নটি তাই আবারও ফিরে আসে, দুর্যোগে শিক্ষা থেমে গেলে ক্ষতি কার? এর উত্তর একজন শিক্ষার্থী, একজন শিক্ষক বা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ক্ষতির ভার বহন করে পুরো সমাজ, পুরো অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র। কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মিত হচ্ছে। সেই ভিত্তি যেন বারবার অপ্রস্তুত অবস্থায় থেমে না যায়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের নীতিনির্ধারণের অন্যতম অঙ্গীকার।

লেখক: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) ও শিক্ষানবিস আইনজীবী।

আরটিভি/ এসআর

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
একটি লং মার্চ। বিশাল মানুষের অংশগ্রহণ। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, স্লোগান সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ছে, তা হলো বড় কোনো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অযাচিত বাধার অভিযোগ নেই।
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের
কিছু রাত কেবল রাত নয়। সময়ের শরীরে তারা কোনো অদৃশ্য চিহ্নের মতো থেকে যায়। কোনো কোনো রাত আবার মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন তার অন্ধকারের মধ্যেও একটি অনাগত আলোর শব্দ শোনা যায়। জন্মাষ্টমীর রাত তেমনই এক রাত।
যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের
সাক্ষাৎকার / রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে : জেট্রো
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে জাপানি কোম্পানিগুলো। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা। কাতাওকা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা জাপানি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জেট্রোর ২০২৫ অর্থবছরের ‘বিদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি’ শীর্ষক জরিপের তথ্য উল্লেখ করে কাতাওকা বলেন, বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ ‘অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে’ বিনিয়োগের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা যে জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি জানান। কাতাওকা বলেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কোম্পানিগুলোকে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিকে সহজ করে দেয়। সম্প্রতি টোকিওতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয় এবং সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর বেড়েছে বলেও জানান তিনি। কাতাওকা বলেন, আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়ায় অনেক কোম্পানি বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনা ও ব্যবসায়িক সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করছে। এই প্রবণতা বাড়ার পেছনে এটিও একটি কারণ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ বেড়ে যাবে,এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে করব্যবস্থা ও শুল্ক ছাড়করণ, লাইসেন্স ও অনুমতি প্রদান এবং আইন ও বিধিবিধানের স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশ ও জাপানের ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে কাতাওকা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও শক্তিশালী বাণিজ্য ও বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারিত্বে উন্নীত করতে হবে। কাতাওকা বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু জাপান থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমরা বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জাপানে বিনিয়োগকেও স্বাগত জানাব। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে শুধু একমুখী বিনিয়োগ উৎসাহিত করাই যথেষ্ট নয়। উভয় দেশের কোম্পানির বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেন বাড়াতে হবে এবং এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজারের প্রতি, বিশেষ করে ঢাকাকে কেন্দ্র করে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান কাতাওকা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৬ শতাংশের অবদান ঢাকার। অন্যদিকে রাজধানীতে মাথাপিছু আয় ৫ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজারের পাশাপাশি ঢাকায় আয় বাড়তে থাকায় রাজধানী ক্রমেই একটি আকর্ষণীয় ভোক্তা বাজারে পরিণত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কাতাওকা বলেন, ঢাকায় উন্নত মান ও সেবার ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। এটি মানসম্মত পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্কহার থাকায় আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। কাতাওকা বলেন, এর ফলে কিছু জাপানি কোম্পানি শুধু রপ্তানির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের কথা ভাবছে না, বরং স্থানীয় উৎপাদন ও স্থানীয়ভাবে পণ্য সংগ্রহের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের বিষয়টি বিবেচনা করছে।  দেশীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা এবং স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনার সমন্বয় আগামী বছরগুলোতে জাপানি বিনিয়োগের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন কাতাওকা। তবে বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও পুনরায় উল্লেখ করেন তিনি। সূত্র: বাসস আরটিভি/এসকে
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে : জেট্রো
আরও পড়ুন
ব্লু ইকোনমিতে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা: শিক্ষামন্ত্রী
সরকারি বরাদ্দে ‘নয়ছয়’ ও শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
ইবিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি তলানিতে, কর্তৃপক্ষের ‘অ্যাকশন প্ল্যান’
অ্যাসাইনমেন্ট থেকে উদ্যোক্তা কুবির তিন শিক্ষার্থী