দুর্যোগে শিক্ষা থেমে গেলে ক্ষতি কার?

সানজিদা জান্নাত পিংকি

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ , ০৮:৫৬ পিএম


দুর্যোগে শিক্ষা থেমে গেলে ক্ষতি কার?
গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) ও শিক্ষানবিস আইনজীবীর সাবেক সভাপতি সানজিদা জান্নাত পিংকি। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

দেশের দুর্যোগের ইতিহাস দীর্ঘ। বন্যা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলাবদ্ধতা, প্রায় প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, পরীক্ষা স্থগিত বা ক্লাস বাতিলের সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলা যায় না। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। দুর্যোগের কারণে শিক্ষা যখন থেমে যায়, তখন সেই ক্ষতির হিসাব কে রাখে?

এ বছরের জুলাই মাসেও সেই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন একাধিক দিনের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নিলেও এর ফলে হাজারো পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পরীক্ষার নতুন সূচি, ফল প্রকাশ এবং পরবর্তী একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবার দুর্যোগের সময় আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান দেখি। কত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে, কত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত সড়ক ডুবে গেছে, এসব তথ্য সামনে আসে। কিন্তু কত শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে পারেনি, কতজনের সেমিস্টার পিছিয়েছে, কতজনের উচ্চশিক্ষা বা চাকরির পরিকল্পনা বিলম্বিত হয়েছে, এসব নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। অথচ এগুলোও দুর্যোগের বাস্তব ক্ষতির অংশ।

শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ক্লাস মিস হওয়া বা একটি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ার প্রভাব সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সমান নয়। যে শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনের সময় ঘনিয়ে এসেছে, কিংবা যার চাকরিতে যোগদানের জন্য সনদ প্রয়োজন, তার কাছে এক মাসের বিলম্বও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। একটি পরীক্ষা স্থগিত হলে শুধু একটি তারিখ পরিবর্তন হয় না। পুরো একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রভাবিত হয়। ফল প্রকাশ পিছিয়ে যায়, পরবর্তী সেমিস্টার শুরু হতে দেরি হয়, গবেষণার সময়সূচি বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি যেমন ব্যক্তিগত ক্ষতি, তেমনি দেশের জন্যও এটি উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তুলতে হবে। শুধু দুর্যোগের সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়; শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা আগেভাগেই প্রস্তুত রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের জটিলতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও বিদ্যালয় বন্ধ ছিল, কোথাও শ্রেণিকক্ষ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, আবার কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে দুর্যোগকে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন শিক্ষা পরিকল্পনার একটি স্থায়ী বাস্তবতা।

করোনা মহামারি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা পুরোপুরি থেমে থাকেনি। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিল। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্যের বাস্তবতাও সামনে এসেছিল। অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট, স্মার্টফোন বা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। ফলে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান যথেষ্ট নয়; অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান প্রয়োজন।

দুর্যোগের সময় আরেকটি বাস্তবতা প্রায়ই সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হলেও শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত অফিস করতে হয়। প্রশাসনিক কিছু কাজের প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে যদি একটি পরিস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একই ঝুঁকির মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়াই কাম্য।

এখানে নীতিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম একাডেমিক পরিকল্পনা, নমনীয় পরীক্ষা সূচি এবং দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা চালু করার সক্ষমতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

সব অঞ্চলের জন্য একই সিদ্ধান্তও সব সময় কার্যকর হয় না। দেশের একটি অংশে বন্যা হলেও অন্য অংশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকতে পারে। তাই অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। এতে যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তেমনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিক্ষা কার্যক্রমও স্থবির হবে না।

দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবকাঠামো। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা মানবিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু একই সঙ্গে এমন পরিকল্পনাও থাকতে হবে, যাতে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পর দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা যায়। কারণ দুর্যোগ শেষ হলেও শিক্ষার ক্ষতি যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়।

আরও পড়ুন

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আজ যে শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আগামীকাল সেই শিক্ষার্থীই দেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আইনজীবী, বিচারক কিংবা প্রশাসক হবে। তার শিক্ষাজীবনের প্রতিটি অযাচিত বিলম্ব শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের গতিকেও প্রভাবিত করে।

দুর্যোগের সময় নিরাপত্তা অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে শিক্ষা পরিকল্পনাও স্থগিত থাকবে। বরং সংকটের মধ্যেও শিক্ষা কীভাবে চালিয়ে নেওয়া যায়, সেই সক্ষমতাই একটি আধুনিক ও দূরদর্শী শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতেই হবে। সেই প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। আগাম পরিকল্পনা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকল্প শিক্ষা, নমনীয় একাডেমিক ক্যালেন্ডার এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার কৌশল, এসবকে আর অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো এখন শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।

দুর্যোগে ভেঙে যাওয়া একটি সেতু পুনর্নির্মাণ করা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত একটি সড়কও একসময় মেরামত হয়। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া সময় পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সময় শিক্ষা খাতকে শুধু একটি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রশ্নটি তাই আবারও ফিরে আসে, দুর্যোগে শিক্ষা থেমে গেলে ক্ষতি কার? এর উত্তর একজন শিক্ষার্থী, একজন শিক্ষক বা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ক্ষতির ভার বহন করে পুরো সমাজ, পুরো অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র। কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মিত হচ্ছে। সেই ভিত্তি যেন বারবার অপ্রস্তুত অবস্থায় থেমে না যায়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের নীতিনির্ধারণের অন্যতম অঙ্গীকার। 

লেখক: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) ও শিক্ষানবিস আইনজীবী।

আরটিভি/ এসআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission