ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

দ্য গার্ডিয়ানের কলাম

ইরান নয়, ট্রাম্পই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদ!

সায়মন টিসডাল

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি অর্থহীন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বাধিয়ে এখন নিজেই সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারও দেশটির বেসামরিক অবকাঠামো ও জাতীয় গ্রিডে নির্বিচারে বোমা হামলা চালাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চালানো এই বর্বর হামলা ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে দুর্বল তো করছেই না, উল্টো দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সপ্তাহেও দাবি করেছেন যে তিনি এই যুদ্ধে ‘বড় জয়’ পাচ্ছেন। ট্রাম্প এবং পেন্টাগনের যুদ্ধবাজ প্রধান পিট হেগসেথ কতবার এমন ভুয়া বিজয়ের দাবি করেছেন? ফলে বিশ্ববাসীর কেউই এখন আর এই ফাঁকা বুলি বিশ্বাস করছে না।

ট্রাম্পের এই পারস্য খামখেয়ালির চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে বিশ্ব এবং আমেরিকার এই অসহায়ত্ব দেখে হাসছে গোটা দুনিয়া।

বর্তমানে হোয়াইট হাউসের একমাত্র ও সীমিত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা, যা ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ এই যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন ও ইসরায়েলি জোটের বড় বড় লক্ষ্য ছিল—ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা, আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। যা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি অলীক মনে হচ্ছে।

ট্রাম্পের ভীরু ও অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে মার্কিন বাহিনী এখন মাঠে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই ইরানকে বিশ্বের জন্য এক চরম অস্তিত্বের সংকট মনে করতেন, তবে তার উচিত ছিল পূর্ণ মাত্রায় স্থল আক্রমণ চালানো। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাককে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন, তখন তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার স্থল সেনা নিয়ে সেখানে আক্রমণ করেছিলেন। সেটি একটি বড় বিপর্যয় ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্তত বুশের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস ছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের সেই সাহস নেই। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে এই যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক পথেও হাঁটবেন না। নিজের অহংকার ধরে রাখতে তিনি সাধারণ মানুষ ও মার্কিন সেনাদের এক অন্তহীন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প এই যুদ্ধে উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপদে ফেলছে, বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংস করছে এবং অনুন্নত দেশগুলোতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ট্রাম্পের এই হঠকারিতা কেবল মস্কো ও বেইজিংয়ের স্বৈরশাসকদেরই আনন্দিত করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে পদদলিত করছে। এত কিছুর পরও তিনি নিজের ভুল মেনে নিয়ে ‘শান্তি আলোচনা’র মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবেন না।

ইরান নয়, বরং ট্রাম্পের আত্মপ্রেমই এখন বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ তিনিই। তিনি একাই একটি জীবন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্র।

এখানে একটি চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেস, মিত্রদেশ কিংবা আমেরিকার জনগণের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল না। তিনি কেবল ইসরায়েলের ধূর্ত প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিজয়ের চটকদার আশ্বাসে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন।

সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্পের যে অগাধ অজ্ঞতা ছিল, তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন দিয়েও দূর করা যায়নি। কারণ, তিনি সেই প্রতিবেদনগুলো পাত্তাই দেননি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প ভেবেছিলেন, প্রণালিটি বন্ধ করার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টাহামলায় ট্রাম্প ‘হতবাক’ হয়েছিলেন। কিন্তু বাকি কেউ অবাক হয়নি। এখন তিনি অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

এই একই ঔদ্ধত্য ও দায়িত্বহীনতা দেখা গিয়েছিল গত বছর ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা ‘শান্তি পরিকল্পনা’র ক্ষেত্রেও। পুনর্গঠন বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কোনো পরিকল্পনাই সেখানে এগোয়নি এবং ট্রাম্প ইতিমধ্যে সেই আগ্রহ হারিয়েছেন। গাজায় হামাস নিরস্ত্রীকরণ তো হয়ইনি, উল্টো তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত হাজারো ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

একইভাবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধেও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ছিল পুরোপুরি নেতিবাচক। ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যায় উদ্দেশ্যকে আড়াল করে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে তিনি এখন কিয়েভের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং পুতিনকে তোষণ করার চেষ্টা করছেন।

ট্রাম্পের সেই বোকামি, অধৈর্য ও দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ইরানে।

এই চোরাবালি থেকে বের হতে না পেরে ট্রাম্প ট্রাম্প এখন ছটফট করছেন। চলতি সপ্তাহের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে জুনের একটি ‘পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক’। এই চুক্তির মাধ্যমে মূল আলোচনার স্বার্থে ৬০ দিনের জন্য সংঘর্ষ স্থগিত রাখার কথা ছিল। ট্রাম্প এই চুক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন।

কিন্তু ট্রাম্পের অন্য সব চুক্তির মতো এটিও ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। তার পঞ্চম অনুচ্ছেদে পরোক্ষভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে একপ্রকার বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে ট্রাম্প তখন তাড়াহুড়ো করে এতে রাজি হলেও এখন তার পরিণতি দেখে পিছু হটছেন। তেহরান যে তাকে বিশ্বাস করে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে তাকে কে বিশ্বাস করে?

ট্রাম্পের ইরান বিপর্যয়ের কারণে হওয়া ক্ষতি এখন সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে।বিশ্ব খুব কমই এমন দৃশ্য দেখেছে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেমন বারবার নেশা করে ভাবেন যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও তেমনি প্রতিদিন ইরানে বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছেন। অথচ আগের কোনো হামলাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। তিনি যত বেশি বোমা ফেলছেন, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী তত বেশি অনমনীয় হচ্ছে এবং সংঘাতের পরিধি আরও বাড়ছে।

এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-টোল আরোপের ঘোষণা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করে নেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার তদারকি করছেন, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগর অবরোধের মতো মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই গভীর জলাভূমি থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন, তা ট্রাম্পের জানা নেই।

ইউরোপীয় মিত্ররা এখন ওয়াশিংটনের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, ওয়াশিংটনের শত্রুরা আনন্দে হাসছে, বিশ্ববাজার আতঙ্কিত এবং তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব ও সম্মান ধূলিসাৎ হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ট্রাম্পকে কে থামাবে? মার্কিন কংগ্রেস তাকে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিলেও তিনি তা অগ্রাহ্য করছেন। জরিপ বলছে, আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মূল্যস্ফীতি বাড়ানো যুদ্ধের বিরুদ্ধে, কিন্তু ট্রাম্প কারও কথা শুনছেন না।

ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনে ট্রাম্পের তিরস্কারের শিকার হয়ে ব্যথিত মিত্ররা স্থায়ী ফাটলের ভয়ে তাকে থামাতে সাহস পাচ্ছে না। পোপ লিও তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখন হয়তো কেবল প্রার্থনাই বাকি আছে।

নিজের সামরিক বিভ্রান্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রেমলিনে বসে পুতিন অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে দেখছেন যে কীভাবে আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে তাদের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, অর্থ ও শক্তি অপচয় করছে।

পশ্চিমা জোটের মধ্যে ফাটল যত বাড়বে, পুতিন তত বেশি খুশি হবেন। অন্যদিকে চীনও এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা তারই ইঙ্গিত দেয়। চীন ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক ও নরম শক্তির দিক থেকে বিশাল সুবিধা পাচ্ছে। আজ হোক বা কাল, সি চিন পিং সামরিকভাবে এর ফায়দা তুলবেন।

ট্রাম্পের এই জটিল ধাঁধার সমাধান শেষ পর্যন্ত আমেরিকার জনগণকেই করতে হবে।কারণ তারাই ভোট দিয়ে এই বিপজ্জনক দানবকে বিশ্বের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। তার এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য শেষ পর্যন্ত তাদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।

১৭৭৬ সালের টমাস জেফারসন এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মতোই আমরা, বিশ্বের মানুষ, এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি: আমেরিকাকে পুনরায় মহান করে তোলা তো দূরের কথা, ট্রাম্প একে আরও ছোট, হীন, অসুখী, বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং ভালোবাসাহীন করে তুলছেন। এখন জরুরিভাবে প্রয়োজন— ২০২৬ সালে ট্রাম্পের কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা।

সায়মন টিসডাল যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের নিয়মিত কলামিস্ট। বিশ্লেষণটি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
ট্রাম্পের সঙ্গে খলিলুর রহমানের শুভেচ্ছা বিনিময়
আইসিসির সব সদস্যকে পদত্যাগের আহ্বান ট্রাম্পের
জাতিসংঘে ইরানকে দুটি প্রস্তাব দিলেন ট্রাম্প
চালু হলো ‘ট্রাম্প টিভি’