যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি অর্থহীন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বাধিয়ে এখন নিজেই সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারও দেশটির বেসামরিক অবকাঠামো ও জাতীয় গ্রিডে নির্বিচারে বোমা হামলা চালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চালানো এই বর্বর হামলা ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে দুর্বল তো করছেই না, উল্টো দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সপ্তাহেও দাবি করেছেন যে তিনি এই যুদ্ধে ‘বড় জয়’ পাচ্ছেন। ট্রাম্প এবং পেন্টাগনের যুদ্ধবাজ প্রধান পিট হেগসেথ কতবার এমন ভুয়া বিজয়ের দাবি করেছেন? ফলে বিশ্ববাসীর কেউই এখন আর এই ফাঁকা বুলি বিশ্বাস করছে না।
ট্রাম্পের এই পারস্য খামখেয়ালির চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে বিশ্ব এবং আমেরিকার এই অসহায়ত্ব দেখে হাসছে গোটা দুনিয়া।
বর্তমানে হোয়াইট হাউসের একমাত্র ও সীমিত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা, যা ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ এই যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন ও ইসরায়েলি জোটের বড় বড় লক্ষ্য ছিল—ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা, আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। যা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি অলীক মনে হচ্ছে।
ট্রাম্পের ভীরু ও অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে মার্কিন বাহিনী এখন মাঠে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই ইরানকে বিশ্বের জন্য এক চরম অস্তিত্বের সংকট মনে করতেন, তবে তার উচিত ছিল পূর্ণ মাত্রায় স্থল আক্রমণ চালানো। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাককে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন, তখন তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার স্থল সেনা নিয়ে সেখানে আক্রমণ করেছিলেন। সেটি একটি বড় বিপর্যয় ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্তত বুশের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস ছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের সেই সাহস নেই। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে এই যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক পথেও হাঁটবেন না। নিজের অহংকার ধরে রাখতে তিনি সাধারণ মানুষ ও মার্কিন সেনাদের এক অন্তহীন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
ট্রাম্প এই যুদ্ধে উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপদে ফেলছে, বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংস করছে এবং অনুন্নত দেশগুলোতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ট্রাম্পের এই হঠকারিতা কেবল মস্কো ও বেইজিংয়ের স্বৈরশাসকদেরই আনন্দিত করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে পদদলিত করছে। এত কিছুর পরও তিনি নিজের ভুল মেনে নিয়ে ‘শান্তি আলোচনা’র মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবেন না।
ইরান নয়, বরং ট্রাম্পের আত্মপ্রেমই এখন বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ তিনিই। তিনি একাই একটি জীবন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্র।
এখানে একটি চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেস, মিত্রদেশ কিংবা আমেরিকার জনগণের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল না। তিনি কেবল ইসরায়েলের ধূর্ত প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিজয়ের চটকদার আশ্বাসে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন।
সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্পের যে অগাধ অজ্ঞতা ছিল, তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন দিয়েও দূর করা যায়নি। কারণ, তিনি সেই প্রতিবেদনগুলো পাত্তাই দেননি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প ভেবেছিলেন, প্রণালিটি বন্ধ করার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টাহামলায় ট্রাম্প ‘হতবাক’ হয়েছিলেন। কিন্তু বাকি কেউ অবাক হয়নি। এখন তিনি অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।
এই একই ঔদ্ধত্য ও দায়িত্বহীনতা দেখা গিয়েছিল গত বছর ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা ‘শান্তি পরিকল্পনা’র ক্ষেত্রেও। পুনর্গঠন বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কোনো পরিকল্পনাই সেখানে এগোয়নি এবং ট্রাম্প ইতিমধ্যে সেই আগ্রহ হারিয়েছেন। গাজায় হামাস নিরস্ত্রীকরণ তো হয়ইনি, উল্টো তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত হাজারো ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
একইভাবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধেও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ছিল পুরোপুরি নেতিবাচক। ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যায় উদ্দেশ্যকে আড়াল করে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে তিনি এখন কিয়েভের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং পুতিনকে তোষণ করার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্পের সেই বোকামি, অধৈর্য ও দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ইরানে।
এই চোরাবালি থেকে বের হতে না পেরে ট্রাম্প ট্রাম্প এখন ছটফট করছেন। চলতি সপ্তাহের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে জুনের একটি ‘পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক’। এই চুক্তির মাধ্যমে মূল আলোচনার স্বার্থে ৬০ দিনের জন্য সংঘর্ষ স্থগিত রাখার কথা ছিল। ট্রাম্প এই চুক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন।
কিন্তু ট্রাম্পের অন্য সব চুক্তির মতো এটিও ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। তার পঞ্চম অনুচ্ছেদে পরোক্ষভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে একপ্রকার বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে ট্রাম্প তখন তাড়াহুড়ো করে এতে রাজি হলেও এখন তার পরিণতি দেখে পিছু হটছেন। তেহরান যে তাকে বিশ্বাস করে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে তাকে কে বিশ্বাস করে?
ট্রাম্পের ইরান বিপর্যয়ের কারণে হওয়া ক্ষতি এখন সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে।বিশ্ব খুব কমই এমন দৃশ্য দেখেছে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেমন বারবার নেশা করে ভাবেন যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও তেমনি প্রতিদিন ইরানে বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছেন। অথচ আগের কোনো হামলাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। তিনি যত বেশি বোমা ফেলছেন, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী তত বেশি অনমনীয় হচ্ছে এবং সংঘাতের পরিধি আরও বাড়ছে।
এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-টোল আরোপের ঘোষণা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করে নেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার তদারকি করছেন, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগর অবরোধের মতো মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই গভীর জলাভূমি থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন, তা ট্রাম্পের জানা নেই।
ইউরোপীয় মিত্ররা এখন ওয়াশিংটনের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, ওয়াশিংটনের শত্রুরা আনন্দে হাসছে, বিশ্ববাজার আতঙ্কিত এবং তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব ও সম্মান ধূলিসাৎ হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ট্রাম্পকে কে থামাবে? মার্কিন কংগ্রেস তাকে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিলেও তিনি তা অগ্রাহ্য করছেন। জরিপ বলছে, আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মূল্যস্ফীতি বাড়ানো যুদ্ধের বিরুদ্ধে, কিন্তু ট্রাম্প কারও কথা শুনছেন না।
ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনে ট্রাম্পের তিরস্কারের শিকার হয়ে ব্যথিত মিত্ররা স্থায়ী ফাটলের ভয়ে তাকে থামাতে সাহস পাচ্ছে না। পোপ লিও তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখন হয়তো কেবল প্রার্থনাই বাকি আছে।
নিজের সামরিক বিভ্রান্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রেমলিনে বসে পুতিন অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে দেখছেন যে কীভাবে আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে তাদের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, অর্থ ও শক্তি অপচয় করছে।
পশ্চিমা জোটের মধ্যে ফাটল যত বাড়বে, পুতিন তত বেশি খুশি হবেন। অন্যদিকে চীনও এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা তারই ইঙ্গিত দেয়। চীন ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক ও নরম শক্তির দিক থেকে বিশাল সুবিধা পাচ্ছে। আজ হোক বা কাল, সি চিন পিং সামরিকভাবে এর ফায়দা তুলবেন।
ট্রাম্পের এই জটিল ধাঁধার সমাধান শেষ পর্যন্ত আমেরিকার জনগণকেই করতে হবে।কারণ তারাই ভোট দিয়ে এই বিপজ্জনক দানবকে বিশ্বের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। তার এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য শেষ পর্যন্ত তাদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।
১৭৭৬ সালের টমাস জেফারসন এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মতোই আমরা, বিশ্বের মানুষ, এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি: আমেরিকাকে পুনরায় মহান করে তোলা তো দূরের কথা, ট্রাম্প একে আরও ছোট, হীন, অসুখী, বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং ভালোবাসাহীন করে তুলছেন। এখন জরুরিভাবে প্রয়োজন— ২০২৬ সালে ট্রাম্পের কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা।
সায়মন টিসডাল যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের নিয়মিত কলামিস্ট। বিশ্লেষণটি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।
আরটিভি/এসএইচএম




