যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে শক্ত জবাব দিয়ে চলেছে ইরান। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। যতটা সহজে ইরানকে পরাস্ত করে দেশটির ইসলামী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো যাবে বলে ভেবেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসন, তেমনটা যে হচ্ছে না, তা ইতোমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে।
যুদ্ধে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও প্রচণ্ড শক্তিক্ষয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলেরও। প্রতিদিনই যুদ্ধব্যয় বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে পড়ে গেছে দুই দেশের সরকার।
এ অবস্থায় এবার সামনে এসেছে ইরানের বিরদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের খবর। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র স্বীকার করেছে, ইরানে হামলার সময় যে হিসাব কষেছিল তারা, সেখানে বড় ধাক্কা লেগেছে। খবর মিডল ইস্ট মিররের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রোববার জানান, যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছিল। তবে, সামগ্রিকভাবে যুদ্ধের অগ্রগতি শুরুর দিকে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, সেই গতিতে হচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুদ্ধের লক্ষ্যমাত্রাগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
ইসরায়েলি সূত্রগুলোর মতে, যুদ্ধের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। ইসরায়েলের কিছু গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, যুদ্ধের সময় ইরানের সাধারণ মানুষ বড় সংখ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করবে। কিন্তু, বাস্তবে তেমন কিছু ঘটতে দেখা যাচ্ছে না, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
তবে সূত্রগুলো দাবি করেছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে ভুল হলেও ইরানের বিষয়ে যৌথভাবে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই পদক্ষেপগুলো আগামী দিনে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
এর আগে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানি আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২ হাজার ২০০টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), সরকারি ভবন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করে। এই অভিযানে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, তারা এসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এসব হামলায় হতাহতের পাশাপাশি কিছু বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজার এবং বিমান চলাচলেও।
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
এর জেরে পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ সামরিক অভিযানে প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবার। সেইসঙ্গে হত্যা করা হয় ইরানের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডারকেও। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরানও। ১৭ দিন ধরে চলমান এই হামলা-পাল্টা হামলায় ইতোমধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন ইরানে।
আরটিভি/এসএইচএম




