যেসব কারণে হরমুজে ইরানের সঙ্গে পারছে না শত্রুপক্ষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ , ০৮:১৪ পিএম


যেসব কারণে হরমুজে ইরানের সঙ্গে পারছে না শত্রুপক্ষ
ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত ২৯তম দিনে গড়িয়েছে শনিবার (২৮ মার্চ)। প্রথম আঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তার পরিবারসহ হত্যার পরও দেশটির ইসলামী শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটাতে না পেরে একের পর এক নেতা ও কমান্ডারকে হত্যা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেইসঙ্গে ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হচ্ছে ইরানের জ্বালানি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনাও। 

বিজ্ঞাপন

তবে, শক্ত জবাব দিয়ে চলেছে তেহরানও। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলনে ভয়ংকর সব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। সেইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকটও তৈরি করে ফেলেছে তারা। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালি। 

সব মিলিয়ে যতটা সহজে ইরানকে পরাস্ত করবেন বলে ভেবেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা, তেমনটা তো হচ্ছেই না; বরং ইরানের জবাবের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ছে তাদের সব পরিকল্পনা।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সারও এই জলপথেই পরিবাহিত হয়। কিন্তু ইরানের ভয়ংকর হামলার মুখে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে প্রবেশাধিকার হারিয়ে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। 

জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হওয়ায় এখন কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত হাজার হাজার সেনা মোতায়েনের উদ্যোগও নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তবে, মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখেও হরমুজ প্রণালিতে ইরান তাদের প্রাধান্য ধরে রেখেছে। স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও সামুদ্রিক মাইন এবং আংশিকভাবে ভৌগোলিক সুবিধা মূল ভূমিকা রেখেছে তাদের এই আধিপত্যের পেছনে।

এই নিয়ন্ত্রণ যেমন সামরিক এবং কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছে ইরান। যুদ্ধের মধ্যেই প্রতিদিন এখন গড়ে ১৩ কোটি ৯০ লাখ (১৩৯ মিলিয়ন) ডলার আয় করছে দেশটি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় ‘জ্বালানির বৈশ্বিক দরজা’। অবরোধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশ যখন বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং তেলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, তখন ইরানের ফ্ল্যাগশিপ জ্বালানি তেল ‘ইরানিয়ান লাইট’ এই রুট দিয়েই অবাধে বহির্বিশ্বে যাচ্ছে। 

বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে ইরান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, যুদ্ধের কারণে ইরানের তেল উত্তোলন মোটেও বাধাগ্রস্ত হয়নি। বরং তেলের জোগান অনিয়মিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে গত ফেব্রুয়ারি মাসে যে পরিমাণ তেল বিক্রি করে ইরান ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করত, বর্তমানে একই পরিমাণ তেল বিক্রি করে তাদের আয় হচ্ছে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

তেল বিক্রির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা মাশুল আদায় করেও বড় অংকের মুনাফা লুটছে তেহরান। গত কিছুদিন ধরে এই রুট দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করছে দেশটি। 

শিপিং বিশ্লেষণ সংস্থা ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ প্রায় ২৪ মাইল প্রশস্ত। তবে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল হয় দুটি প্রধান শিপিং লেন দিয়ে, যা আরও সংকীর্ণ। বিশেষজ্ঞরা একে যথার্থ কারণেই ‘চোকপয়েন্ট’ বলে অভিহিত করেন। পৃথিবীতে আরও অনেক চোকপয়েন্ট থাকলেও, বিকল্প পথের অভাবে এটি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং।

সংকীর্ণ এই পথের কারণে জাহাজের চলাচলের সুযোগ সীমিত। উন্মুক্ত সমুদ্রে বিকল্প রুট নেওয়া সম্ভব হলেও, এমন সংকীর্ণ জলপথে তা কার্যত অসম্ভব। ফলে ইরানকে লক্ষ্য খুঁজে বের করতে হয় না, তারা অপেক্ষা করলেই চলে।

এছাড়া, ইরানের প্রায় ১ হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূল রয়েছে, যেখান থেকে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোবাইল লঞ্চার থেকে নিক্ষেপযোগ্য হওয়ায় এগুলো ধ্বংস করা কঠিন।

ইরানের উত্তর উপকূল সমতল নয়। সেখানে পাহাড়, উপত্যকা, দ্বীপ ও জনবসতি রয়েছে, যা শত্রুর নজরদারি কঠিন করে তোলে। আর ইরানের জন্য মোবাইল লঞ্চার লুকিয়ে রাখাও তুলনামূলক সহজ।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের নৌবাহিনীর সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে, ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা প্রায় অসম্ভব। ভবিষ্যতেও এই হুমকি বজায় থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিপক্ষের প্রচলিত নৌ সক্ষমতা দুর্বল করতে সক্ষম হলেও সবচেয়ে বড় হুমকি এখনো ইরানের অপ্রচলিত অস্ত্রভাণ্ডার। যেমন ড্রোন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান এবং বিস্ফোরকবোঝাই চালকবিহীন নৌকা দিয়ে ইরান মুহূর্তেই যেকোনও তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ চালাতে পারে।

এছাড়া, ইরান সাধারণ নৌকা থেকেও সমুদ্রে মাইন ফেলে দিতে পারে। বড় সাবমেরিনের পাশাপাশি ছোট আকারের সাবমেরিনও হুমকি হয়ে থাকতে পারে, যা অগভীর পানিতে সহজে চলাচল করতে সক্ষম।

ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অন্তত ১৯টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য পূরণে জাহাজ ধ্বংস করা অপরিহার্য নয়। শুধু হুমকি দিলেই শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নেবে না। 

আর এদিকে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেসব দেশের সঙ্গে ইরানের বৈরিতা নেই, তাদের জাহাজগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করলে প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। এই প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি জাহাজ পার হয়েছে। যার মধ্যে একটি জাহাজ ২০ লাখ ডলার ফি দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

আরটিভি/এসএইচএম   

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission