হঠাৎ গণহারে পাকিস্তানিদেরকে তাড়িয়ে দিচ্ছে আরব আমিরাত!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

সোমবার, ১১ মে ২০২৬ , ০৬:২২ পিএম


হঠাৎ গণহারে পাকিস্তানিদেরকে তাড়িয়ে দিচ্ছে আরব আমিরাত!
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হঠাৎ গণহারে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পাকিস্তানি শ্রমিকদেরকে। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকটের হুমকি তৈরি হয়েছে এ পরিস্থিতিতে।

সোমবার (১১ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে পাকিস্তান। এই টানাপোড়েনের জেরেই মূলত পাকিস্তানিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে  আমিরাত কর্তৃপক্ষ।  

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকেই এই বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলে পাকিস্তানের সাধারণ শ্রমিকরা এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন, যাদের আয়ের ওপর দেশে থাকা লক্ষাধিক মানুষ নির্ভরশীল। 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তির চেষ্টা করলেও আমিরাতের ওপর ইরানি হামলার বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান যথেষ্ট কঠোর ছিল না। যুদ্ধের শুরু থেকেই হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে আমিরাত। মূলত, পাকিস্তানের এই নমনীয় অবস্থানেই ক্ষুব্ধ হয়েছে আবুধাবি।

সম্প্রতি আমিরাতের বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত ২০ জনের বেশি পাকিস্তানি শিয়া কর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। তারা সবাই জানিয়েছেন, গত এক মাসে তাদের হঠাৎ করে গ্রেপ্তার, আটক ও পরে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তানের শিয়া ধর্মীয় নেতাদের দাবি, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার পাকিস্তানি শিয়া কর্মীকে আমিরাত থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

পাকিস্তানে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিয়া মুসলিমের বসবাস, যাদের সঙ্গে ইরানের গভীর আধ্যাত্মিক যোগসূত্র রয়েছে। যদিও বিতাড়নের সুনির্দিষ্ট কারণ কোনও পক্ষই স্পষ্ট করেনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি গণহারে বিতাড়নের বিষয়টি অস্বীকার করে দাবি করেছেন, যারা আমিরাতে অপরাধ করেছে কেবল তাদেরই ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে শিয়াদের আলাদা করে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।

অন্যদিকে, আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ আমিরাতি-লেবানিজ ভাষ্যকার নাদিম কোটেইচ বলেন, আমিরাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় না করেই পাকিস্তান এই শান্তি উদ্যোগ শুরু করেছিল।

আমিরাতের ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা গেছে আর্থিক খাতেও। গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানের কাছ থেকে তাদের ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ ফেরত চেয়েছে, যা পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তবে, এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এগিয়ে এসে পাকিস্তানের রিজার্ভ সচল রাখতে ৩০০ কোটি ডলার জমা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।

আরও পড়ুন

আবুধাবিতে অবস্থিত আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, আমিরাত অবাক হয়েছে যে ইরান ইস্যুতে পাকিস্তান তাদের সমর্থন দেয়নি, আর পাকিস্তান অবাক হয়েছে এটা দেখে যে আমিরাত কেন অবাক হলো!

উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ লাখের বেশি পাকিস্তানি বসবাস করেন, যারা গত বছর প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন। পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেন, আমিরাতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, এই যুদ্ধে পাকিস্তান আর কোন পথ বেছে নিতে পারত, তাও আমার জানা নেই।

বিতাড়িত শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনও ধরনের ব্যাখ্যা বা নিজেদের মালামাল গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। ২৫ বছর বয়সী আলী হামজা জানান, গত ১৩ এপ্রিল এক সাদাপোশাকের কর্মকর্তা তাকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে আল-আউইর আটক কেন্দ্রে নিয়ে যান এবং ২১ এপ্রিল তাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের শের কোট গ্রামের ট্যাক্সিচালক হায়দার আলী বঙ্গশ বলেন, তারা আমাদের কোনও কারণ বলেনি। কিন্তু আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের একমাত্র অপরাধ আমরা শিয়া।”

দুবাইয়ের পাকিস্তানি কনস্যুলেট থেকে দেওয়া নথিতে বিতাড়নের কারণ হিসেবে ‘জেলে থাকা বা পলাতক’ লিখে দেওয়া হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্তত ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানিয়েছেন, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানি কর্মীদের ভিসা নবায়ন করা বন্ধ করে দিয়েছে অথবা সরাসরি বিতাড়নের নির্দেশ দিচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভিসা ইস্যু করাও স্থগিত রাখা হয়েছে।

আবুধাবিতে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, গত মাসে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তার এক শিয়া পাকিস্তানি টেকনিশিয়ানকে আটক কেন্দ্রে নিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান এখন একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বের মাঝে আটকা পড়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে সম্প্রতি সৌদি ও আমিরাতের মধ্যে বিভেদ বাড়ছে। এর মধ্যে পাকিস্তান গত বছর সৌদির সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনও এক দেশে হামলা হলে তা অন্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে আমিরাত মোটেও খুশি নয়।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission