প্রায় ৫৫ লাখ বর্গমাইল আয়তনের রহস্যে ঘেরা এক মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম এ মহাদেশের প্রায় পুরোটাই পুরু বরফে ঢাকা। স্থায়ী মানব বসতির জন্য কোনভাবেই উপযুক্ত নয় বিস্তীর্ণ এ অঞ্চল। বরফে ঢাকা সাদা এই মহাদেশের অনেকাংশে এখনও পা পড়েনি মানুষের। অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে এই মহাদেশের।
তবে, গবেষকরা বলছেন, শুরু থেকেই এমন ছিল না অ্যান্টার্কটিকা! কোটি কোটি বছর আগে এই মহাদেশ ছিল সবুজে ঘেরা বনভূমি। ছিল গভীর জঙ্গল। বর্তমানে মানুষের বসবাসের অযোগ্য এ মহাদেশেই চাঁই চাঁই বরফের নীচে লুকিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া ‘পৃথিবী’। সবুজে ঘেরা এক গভীর বনভূমি হারিয়ে গেছে অ্যান্টার্কটিকার বরফের তলায়।
অ্যান্টার্কটিকায় এখনও কিছু গাছ দেখা যায়। সেগুলো মূলত গুল্মজাতীয়। গবেষকেরা দাবি করছেন, গুল্মজাতীয় নয়, এক কালে বড় বড় উদ্ভিদও ছিল অ্যান্টার্কটিকায়। এখন যে সব অঞ্চলে গুটি গুটি পায়ে পেঙ্গুইনেরা ঘুরে বেড়ায়, সেই সব জায়গা বহু বছর আগে ভরে থাকত সবুজ বনভূমিতে।
অ্যান্টার্কটিকায় কোনও কালেই স্থায়ীভাবে মানব বসতি গড়ে ওঠেনি। শুধুমাত্র গবেষণার কাজে সাময়িক ভাবে সেখানে মানুষ থাকে। কয়েক বছর আগে তেমনই এক গবেষণা চলছিল ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট জেমিসনের নেতৃত্বে। অ্যান্টার্কটিকার বরফের আস্তরণে কী ভাবে ছোট ছোট পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়েই গবেষণা করছিলেন তারা। সেই সূত্র ধরে মহাদেশের কঠিন বরফের গায়ে গর্ত খুঁড়তে শুরু করেন তারা। প্রায় দুই কিলোমিটার গভীর গর্ত খোঁড়ার পরে তারা এমন কিছু খুঁজে পান, যা এই মহাদেশ নিয়ে বিশ্ববাসীর ধ্যানধারণাই বদলে দেয়।
ড্রিল মেশিন দিয়ে সাবধানে একটু একটু করে বরফের গায়ে গর্ত করা হচ্ছিল। সেই গর্ত খুঁড়ে প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে যাওয়ার পরে তারা খুঁজে পান এক হারিয়ে যাওয়া জগৎ। বরফের নীচে চাপা পড়ে থাকা পলির নমুনায় পাওয়া যায় উদ্ভিদের জীবাশ্ম। তার মধ্যে যেমন রয়েছে পরাগরেণুর নমুনা, তেমনই রয়েছে গাছের পাতার টুকরো টুকরো জীবাশ্ম । বহু বছর আগে মৃত কিছু অণুজীবের নমুনাও মেলে। ওই নমুনাগুলো পরীক্ষা করে গবেষকদের দাবি, এগুলো প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছরের পুরনো।
পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার উইলকিস ল্যান্ড এলাকায় এই গবেষণাটি চালান জেমিসনরা। তাদের দাবি, উদ্ভিদের যে ধরনের নমুনা মিলেছে, তা আভাস দেয়, পুরো এলাকাই এক সময়ে গভীর অরণ্যে মোড়া ছিল। জেমিসনের কথায়, এটা একটি টাইম ক্যাপসুলের মতো। এটা এমন এক সময়ের হারিয়ে যাওয়া জগতের কথা বলে, যখন অ্যান্টার্কটিকা এখনকার মতো বরফে মোড়া প্রান্তর ছিল না।
বরফের নিচে হারিয়ে যাওয়া এই বনভূমির সন্ধান পাওয়ার পরে গবেষণা আরও প্রশস্ত করেন জেমিসনেরা। গবেষণার জন্য তারা কানাডার কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থা ‘র্যাডারস্যাট’-এর সাহায্য নেন। ওই কৃত্রিম উপগ্রহ-প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা বরফের স্তরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তাতে ভূপৃষ্ঠে নদী-উপত্যকার মতো কিছু গড়ন দেখতে পান তারা। গবেষকদের অনুমান, কোটি কোটি বছর আগে এই অ্যান্টার্কটিকায় নদীও ছিল।
যদিও এই বনভূমি যে সময়ে তৈরি হয়েছিল, তখন অ্যান্টার্কটিকা আক্ষরিক অর্থে অ্যান্টার্কটিকা হয়ে ওঠেনি। জন্মই হয়নি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের। তখন এই অংশটি ছিল ‘সুপার কন্টিনেন্ট’ গন্ডোয়ানার অংশ। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিশে ছিল অ্যান্টার্কটিকাও। ১৮ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে গন্ডোয়ানা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। তৈরি হতে থাকে এক একটি মহাদেশ। গবেষকদের দাবি, তার আগে পর্যন্ত এই অ্যান্টার্কটিকায় নদী-জঙ্গল সবই ছিল। ‘সুপার কন্টিনেন্ট’ ভেঙে যাওয়ার পরেও সেগুলোর অস্তিত্ব ছিল। তারপর ধীরে ধীরে বরফের চাদরের নিচে চাপা পড়ে যায় সুবিশাল এই বনভূমি।
অ্যান্টার্কটিকায় এই হারিয়ে যাওয়া এ অরণ্যের সন্ধান পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কাছে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন জেমিসনরা। তাদের বক্তব্য, কোটি কোটি বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার গড়ন, বিশেষত বরফের স্তর কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করবে এই গবেষণা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আগামী দিনের গবেষণাতেও অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
আরটিভি/এসএইচএম




