পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭ আসনে জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। তবে, এই জয়ের পেছনে ‘বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার এক চাঞ্চল্যকর প্রভাব সামনে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপির জেতা বেশিরভাগ আসনেই দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'স্ক্রল'-এর এক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ১০৫টি আসনে বিজেপি যে ব্যবধানে জয় পেয়েছে, বিশেষ নিবিড় যাচাই (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় তার চেয়েও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ৮৬টি আসন এমন, যেখানে বিজেপি আগে কখনোই জিততে পারেনি।
সোমবার (৪ মে) ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি মোট ২০৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ, এই ১০৫টি আসন দলটির মোট জয়ের প্রায় অর্ধেক। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ঐতিহাসিক দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়েছে হিন্দুত্ববাদী এই দল। এর মাধ্যমে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটল।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বা ভোটার তালিকা যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ছয় মাস ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যার ফলে রাজ্যের মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ শতাংশ কমে যায়। বাদ পড়া এই ৯১ লাখ ভোটারের মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনো ঝুলে আছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এক অস্বাভাবিক প্যাটার্ন
সোমবারের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে নির্বাচনে জনগণের মমতাবিরোধী মনোভাব কাজ করেছে। এর ফলেই গতবার ২১৫টি আসন পাওয়া তৃণমূল কংগ্রেস এবার মাত্র ৮০টি আসন পেয়েছে। তবে স্ক্রলের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, তৃণমূলের এই পরাজয়ে এসআইআর প্রক্রিয়াও বড় ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে স্ক্রল এই বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যায়, অন্তত ১০৫টি আসনে বিজেপি এমন ব্যবধানে জয় পেয়েছে, যা ভোটের আগে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মোট ভোটারের সংখ্যার চেয়েও কম। বাদ পড়া ভোটারদের এই তথ্য সংকলন করেছে কলকাতার নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সবর ইনস্টিটিউট'।
বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস আসনটি এর একটি বড় উদাহরণ। ২০২১ সালের নির্বাচনেও এই আসনে জিতেছিল বিজেপি। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী এই দলের চেয়ে ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। এরপর শুরু হয় এসআইআর প্রক্রিয়া, যেখানে এই আসন থেকে ৭ হাজার ৫১৫ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। সোমবারের ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি এই আসনে মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছে।
এই ১০৫টি আসনের বড় অংশেই বিজেপি আগে কখনো জেতেনি। গত নির্বাচনে তৃণমূল জিতেছিল এমন ১২৯টি আসন এবার বিজেপির কাছে হাতছাড়া হয়েছে। অন্যদিকে, পাঁচ বছর আগে বিজেপি যেসব আসনে জিতেছিল, তার প্রতিটিই এবার ধরে রাখতে পেরেছে তারা।
এই বিশ্লেষণের সুবিধার্থে, এবার যে আসনগুলো তৃণমূলের হাত থেকে বিজেপির পকেটে গেছে, সেগুলোকে 'সুইং সিট' (যেখানে ভোটারদের মনোভাব বদলেছে) বলা হয়েছে। স্ক্রল দেখতে পেয়েছে, এমন ৮৬টি সুইং সিটে বিজেপির জয়ের ব্যবধান এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম।
উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর বিধানসভা আসনের কথা বলা যায়। কয়েক দশক ধরে এটি কমিউনিস্টদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এখানকার বিধায়ক ছিলেন। মমতার ক্ষমতা দখলের পরও এই আসনটি মূলত তৃণমূল এবং সিপিআই(এম)-এর মধ্যেই হাতবদল হয়েছে।
২০২১ সালে তৃণমূল এই আসনে জিতেছিল এবং সিপিআই(এম) হয়েছিল দ্বিতীয়। আর বিজেপি প্রার্থী ৫৩ হাজার ১৩৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। গত মাসে যাদবপুরে সরেজমিন ঘুরে স্ক্রলের মনে হয়েছিল, এবারও মূল লড়াই সিপিআই(এম) এবং তৃণমূলের মধ্যেই হবে।
কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদবপুর থেকে ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। আর সোমবারের ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি এই আসনে ২৭ হাজার ৭১৬ ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো জয় পেয়েছে, যা বাদ পড়া ভোটারের অর্ধেকেরও কম।
পতন হলো তৃণমূলের অনেক শক্ত ঘাঁটির
সোমবারের ফলাফলে তৃণমূলের অনেক পরিচিত ও শক্ত ঘাঁটির পতন হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা যেসব এলাকাকে তৃণমূলের নিশ্চিত জয়ের এলাকা বলে মনে করতেন, সেখানকার অনেক হেভিওয়েট নেতাও এবার হেরে গেছেন।
বিদায়ী সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবার তার টালিগঞ্জ আসনে হেরে গেছেন। বিজেপি প্রার্থী সেখানে ৬ হাজার ১৩ ভোটে জয় পেয়েছেন। অথচ এসআইআর প্রক্রিয়ায় ওই আসন থেকে ৩৭ হাজার ৮৮৯ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
শশী পাঁজা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক এবং স্নেহাশিস চক্রবর্তীসহ অন্তত আরও ১০ জন মন্ত্রীরও একই পরিণতি হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের আসনেই জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল।
তৃণমূল প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার নিজের আসন ভবানীপুরে বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরে গেছেন। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের দখলে থাকা এই আসনে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৫১ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
আরটিভি/এমএম



