ইরান যুদ্ধে যেভাবে হুমকিতে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ 

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ , ০৭:১৩ পিএম


ইরান যুদ্ধে যেভাবে হুমকিতে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা
ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার ত্রিমুখী যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, সার, ওষুধ, হিলিয়াম ও অর্থের উপর থেমে থাকেনি, সমুদ্রপথের পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবনেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে তিমিদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি।

২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করলে প্রথম এই রুটে বিঘ্ন ঘটে। অতি সম্প্রতি, বর্তমানে ইরানের অবরোধের মুখে থাকা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের পথ ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে ঘুরপথে জাহাজ পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের ফলে ওই এলাকায় জাহাজ চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘পোর্টওয়াচ মনিটর’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে পাড়ি দিয়েছে। ২০২৩ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪টি।

দক্ষিণ আফ্রিকার জলসীমায় ৪০টিরও বেশি প্রজাতির তিমির বাস। দেশটির দক্ষিণপ্রান্ত ‘কেপ অব গুড হোপ’ মূলত সাউদার্ন রাইট হোয়েল, হাম্পব্যাক হোয়েল এবং ব্রাইডস হোয়েলের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র। এছাড়াও এখানে ওড়কা বা কিলার হোয়েল, স্পার্ম হোয়েল, মিঙ্ক হোয়েল এবং ডলফিন দেখা যায়।

আরও পড়ুন

বিশেষ করে হাম্পব্যাক তিমির এক বিশাল দল এই এলাকায় খাবার খায় এবং এখান থেকেই অ্যান্টার্কটিকার দিকে তাদের বার্ষিক পরিভ্রমণ শুরু করে। কর্তৃপক্ষের মতে, এটি পৃথিবীতে পরিচিত হাম্পব্যাক তিমির বৃহত্তম দল। কিছু গবেষণায় এদের সংখ্যা ১১ হাজার থেকে ১৩ হাজার বলা হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীতে বাণিজ্যিক শিকারের কারণে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে পড়েছিল। বর্তমানে সাউদার্ন রাইট ও হাম্পব্যাক তিমির সংখ্যা বাড়লেও অ্যান্টার্কটিক ব্লু, ফিন এবং সসেই তিমির মতো প্রজাতিগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার ‘রেড লিস্ট’-এ এখনও ‘বিপন্ন’ বা ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত।

জাহাজ চলাচল বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তিমির ওপর। প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এলস ভারমিউলেন বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, 'অনেক সময় কার্গো জাহাজে থাকা ব্যক্তিদের করা ভিডিওতে দেখা যায় তারা হাম্পব্যাক তিমির বিশাল পালের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।'

আইডব্লিউসি সভায় উপস্থাপিত এই গবেষণার প্রধান ভারমিউলেন বলেন, তিমিরা প্রায়ই বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকে না, বিশেষ করে যখন তারা খাবার খেতে ব্যস্ত থাকে। তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তারা লেখে—‘বাহ, দেখ কত সুন্দর সব তিমি দেখছি’। কিন্তু তা দেখে আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়; কারণ আমি জানি ওই জাহাজগুলো হয়তো দু-একটি তিমিকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, দ্রুতগতির জাহাজ চলাচল (যা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ) এখন এই এলাকায় চার গুণ বেড়েছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের ‘প্রটেক্টিং হোয়েলস অ্যান্ড ডলফিনস ইনিশিয়েটিভ’-এর বৈশ্বিক প্রধান ক্রিস জনসন বলেন, তিমিরা এখনও জাহাজের গতির সাথে মানিয়ে নিতে শেখেনি। তিনি বলেন, আপনি হয়তো ভাবছেন বিকট শব্দ শুনলে তারা চলে যাবে। কিন্তু কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে তা ঘটে না।

আরও পড়ুন

উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, লস অ্যাঞ্জেলেসে নীল তিমিরা যখন জাহাজের শব্দ শোনে, তখন তারা পালানোর বদলে উল্টো পানির নিচে তলিয়ে যায়, যা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ায়।

ব্লু ইকোনমি কনসালট্যান্ট কেন ফিন্ডলে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিমির আচরণগত পরিবর্তনও তাদের ঝুঁকিতে ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ আফ্রিকার হাম্পব্যাক তিমিরা ২০১১ সাল থেকে পশ্চিম উপকূলে খাবার সংগ্রহ শুরু করেছে, যা এখন অত্যন্ত ব্যস্ত একটি রুট।

গবেষকরা বলছেন, মানুষের তৎপরতা বাড়ার সাথে সাথে এই ঝুঁকিও বাড়ছে। ভারমিউলেনের দল ২০২২ সালের নভেম্বরে সাউদার্ন রাইট তিমির মৃত্যু নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছিল। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোট ৯৭টি তিমির মৃত্যুর মধ্যে ১১টি সরাসরি জাহাজের ধাক্কায় হয়েছে। এছাড়া আরও ১৬টি তিমির শরীরে জাহাজের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল যা সরাসরি মৃত্যুর কারণ কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, জাহাজের ধাক্কায় তিমির মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরও অনেক বেশি। কারণ মাঝসমুদ্রে জাহাজের ধাক্কায় মারা যাওয়া তিমিরা প্রায়ই সাগরের তলদেশে তলিয়ে যায়, ফলে সেগুলো গণনায় আসে না।

ভারমিউলেনের দলের প্রস্তাব অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকা উপকূল থেকে জাহাজ চলাচলের পথ যদি সামান্য কিছুটা সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে কিছু প্রজাতির তিমির মৃত্যুর ঝুঁকি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক কোম্পানি এমএসসি ইতিমধ্যেই গ্রিস ও শ্রীলঙ্কা উপকূলে তিমির বিচরণ ক্ষেত্র রক্ষায় তাদের জাহাজের পথ পরিবর্তন শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের গতি কমানোর কর্মসূচিও প্রাণঘাতী সংঘর্ষ এবং পানির নিচের শব্দদূষণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া রেডিও বার্তা বা বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে জাহাজের ক্যাপ্টেনদের তিমির অবস্থানের খবর জানানোর বিষয়টিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেপ অব গুড হোপের তিমিদের রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা শেষ হওয়ার পর সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission