যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার সেই ক্ষণটিতে একই ভবনে উপস্থিত ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পাওয়া এই শীর্ষ কূটনীতিক সম্প্রতি লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল আল-মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রথমবারের মতো সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বিবরণ প্রকাশ করেছেন।
আরাঘচি জানান, জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে সেদিন সকাল ৯টার দিকে তিনি সুপ্রিম লিডারের কার্যালয়ে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল খামেনিকে জানানো যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে যুদ্ধ এখন অনিবার্য। আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কার্যালয়ের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক এমন সময় ভবনটিকে লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। তবে সৌভাগ্যক্রমে তিনি যে অংশে অবস্থান করছিলেন, সেটি ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়।
হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোনোমতে বের হয়ে আসার মুহূর্তটিকে জীবনের অন্যতম রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের হয়ে আসার পর আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, সুপ্রিম লিডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কি না, তিনি নিরাপদ আছেন কি না। সে জন্য তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চলে যান এবং সেখানেই জানতে পারেন যে সুপ্রিম লিডার নিহত হয়েছেন।
দেশ ও নিজের ওপর নেমে আসা এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে আরাঘচি জানান, ঘটনার পর দীর্ঘ ৪০ দিন তিনি নিজের বাড়ি বা কোনো আত্মীয়ের বাসাতেও যাননি; বরং মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করেই অবিরাম রাষ্ট্রীয় ও যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, তৎকালীন সংকটময় সময়ে ইরানকে ঘিরে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি ও হুমকি থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ নেতা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সাংবাদিক আরাঘচির কাছে জানতে চান, খামেনিকে কি সত্যিই অত্যন্ত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন? জবাবে আরাঘচি বলেন, খামেনি বলেছিলেন, ‘ইরানের প্রতিটি মানুষ যদি নিরাপদ আশ্রয় ও বাঙ্কারে যাওয়ার সুযোগ পায়, তবেই আমি নিরাপদ স্থানে যাব। যেহেতু বর্তমানে সেই সুযোগ সবার জন্য নেই, তাই আমিও জনগণের সঙ্গে মাটির ওপরই থাকব। আমার জনগণের ভাগ্যে যা ঘটবে, আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে।’
আরাঘচি বলেন, এই বক্তব্যই দেখিয়ে দেয় হৃদয় জয় করা একজন নেতার সঙ্গে কেবল রাষ্ট্র পরিচালনাকারী নেতার পার্থক্য। তার ভাষায়, ‘আমাদের নেতা মানুষের হৃদয় শাসন করতেন।’ সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা সরাসরি খামেনির কাছ থেকেই এসেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাদের মিত্রদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আরাঘচি বলেন, ইরানের পাল্টা জবাব দেখে পুরো বিশ্বই বিস্মিত হয়েছিল। তার মতে, তেহরানের বিরুদ্ধে যে মাত্রার হামলা চালানো হয়েছিল, তাতে অনেকেই মনে করেছিলেন ইরান তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দিতে সক্ষম হবে না, কিন্তু ইরান দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে।
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ। পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। এই হামলায় প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী, যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে বিশ্ব তেল বাণিজ্যেও। এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। টানা ৩৮ দিন হামলা-পাল্টা হামলার পর গত ৭ এপ্রিল ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। গত ২৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালায়নি, তবে কোনো ধরনের স্থায়ী সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারেনি তারা।
আরটিভি/এআর




