রাশিয়ার একটি সু-৩৫ (Su-35) যুদ্ধবিমান প্রায় ১৯০ কিলোমিটার দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইউক্রেনের একটি মিগ-২৯ (MiG-29) যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। দাবি সত্য হলে, এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ফাইটার জেট থেকে ফাইটার জেট ভূপাতিতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্বের সফল হামলার অন্যতম নজির হতে পারে।
শনিবার (২৭ জুন) মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলাহয়, শুক্রবার (২৬ জুন) দিবাগত রাতে এই দুর্ধর্ষ ঘটনা ঘটে। আধুনিক সামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে ফাইটার-টু-ফাইটার ভূপাতিতের ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম রেকর্ড হতে পারে।
পোলতাভা অঞ্চলে যুদ্ধ মিশনের সময় একটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান হারানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষও। ফলে ঘটনাটি সত্য বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে ইউক্রেন জানিয়েছে, বিমানের পাইলট নিরাপদে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন এবং প্রাণে বেঁচে যান।
রাশিয়াপন্থি সামরিক সূত্র এবং একাধিক উন্মুক্ত গোয়েন্দা বিশ্লেষকের দাবি, রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত বেলগোরোদ অঞ্চলের আকাশসীমা থেকে একটি সু-৩৫এস যুদ্ধবিমান দূরপাল্লার আর-৩৭এম (এয়ার টু এয়ার) নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে। এতে ইউক্রেনের মিগ-২৯ বিমানটিকে ভূপাতিত হয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বেলগোরোদের পশ্চিমাংশ থেকে পোলতাভা অঞ্চলের ভেলিকা বাহাচকা বা শিশাকি এলাকার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সরলরৈখিক দূরত্ব প্রায় ১৮৫ থেকে ১৯০ কিলোমিটার, যা এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা দেখায় যে রাশিয়া এখন গভীর নিরাপদ আকাশসীমায় নিজেদের যুদ্ধবিমান রেখে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, স্থলভিত্তিক রাডার এবং সুরক্ষিত ডেটা লিংকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করছে।
এছাড়া আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে রাশিয়া ইউক্রেনের পুরোনো মিগ-২৯ ও সু-২৭ যুদ্ধবহরের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে, যেগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো ভিডিও বা ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশিত হয়নি, যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে বিমানটি আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্রেই ভূপাতিত হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রতিবেদনে জানায়, রাশিয়ার সুখোই-৫৭ এবং মিগ-৩১বিএম যুদ্ধবিমান অত্যন্ত দীর্ঘ দূরত্ব থেকে ইউক্রেনীয় যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে হামলা চালাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
এর পরের মাসে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য কনভারসেশন এক প্রতিবেদনে দাবি করে, রাশিয়ার মিগ-৩১ এবং সুখোই-৫৭ যুদ্ধবিমান আর-৩৭এম দূরপাল্লার অতিদ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রুশ আকাশসীমার ভেতর থেকেই ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে থাকা ইউক্রেনীয় যুদ্ধবিমানে আঘাত হেনেছে।
২০২৩ সালের মার্চে রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম স্পুটনিককে দেয়া এক সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযানে আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্র সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ওই সূত্র দাবি করে, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্রই একটি ইউক্রেনীয় সামরিক বিমান ধ্বংস করতে যথেষ্ট হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, সুখোই-৫৭ বা মিগ-৩১বিএম এর তুলনায় দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধে সু-৩৫ কিছুটা কম সক্ষম হলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এটি একাধিক ইউক্রেনীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
তবে সু-৩৫ এর রাডার মিগ-৩১বিএম এর মতো শক্তিশালী নয়। ফলে নিজস্ব রাডারের ওপর নির্ভর করলে এটি আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না। দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য মিগ-৩১, আকাশভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অথবা সামনের সারিতে মোতায়েন স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছ থেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য নেয়া প্রয়োজন হয়।
তবে বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সু-৩৫ এর ইরবিস-ই রাডারের লক্ষ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা অধিকাংশ পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের রাডারের চেয়ে বেশি। কেবল কিছু উন্নত সংস্করণের মার্কিন যুদ্ধবিমান এ ক্ষেত্রে সমতুল্য হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এই রাডারকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বলা হয় না, তবুও এর আকার ও উচ্চ ক্ষমতা এটিকে উল্লেখযোগ্য কার্যকারিতা দিয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এর রাডারের আকার মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের এএন/এপিজি-৮১ রাডারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড়। উঠে আসছে।
আরটিভি/এমএইচজে



