একটা সময় ছিল, যখন গাজার শিশুরা বিকেল হলেই রাস্তায় নেমে খেলত ফুটবল। হাসির শব্দে মুখর থাকত পাড়া। কিন্তু আজ সেই একই রাস্তায় পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। বাতাসে মিশে আছে পোড়া কংক্রিটের গন্ধ। আর রাত নামলেই নতুন এক ভয়। শুধু বোমা নয়, এবার ঘুমন্ত শিশুদের ওপর হামলা করছে ইঁদুর। যুদ্ধবিরতির আট মাস পেরিয়ে গেলেও গাজার মানুষের জীবনে যেন এখনো পৌঁছায়নি কোন শান্তি।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে ১৪ বছরের কারাম এখনো একটি পুরোনো ফুটবল আঁকড়ে ধরে হাঁটে। একসময় তার স্বপ্ন ছিল বড় ফুটবলার হওয়ার। বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিন মাঠে খেলত। কিন্তু এখন চারপাশে নেই সেই মাঠ, নেই সেই বন্ধুদের কোলাহল। আছে শুধু ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি, পুড়ে যাওয়া জমি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে এই তথ্য।
যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার বলা হয়েছে শান্তির কথা। এসেছে নতুন পরিকল্পনা, নতুন বৈঠক ও নতুন প্রতিশ্রুতির খবরও। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। তাদের ভাষায়, কাগজে যুদ্ধ থামলেও বাস্তবে এখনো শেষ হয়নি যুদ্ধ।
চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার, নতুন প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই হয়নি বাস্তবায়িত। বরং ইসরায়েল গাজার আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় বাড়িয়েছে সামরিক উপস্থিতি। অন্যদিকে হামাসও অস্ত্র সমর্পণ না করে শক্ত করেছে নিজেদের অবস্থান। ফলে সাধারণ মানুষ আটকে পড়েছে দুই পক্ষের সংঘাতের মাঝখানে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরগুলোতে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯ লাখ মানুষ হারিয়েছে নিজেদের ঘর। হাজার হাজার পরিবার এখনো গাদাগাদি করে বসবাস করছে অস্থায়ী তাঁবুতে। সেখানে নেই পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি। নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। ময়লা জমে থাকে চারদিকে। দুর্গন্ধে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন আতঙ্ক। ইঁদুর, তেলাপোকা ও অন্যান্য প্রাণী সহজেই তাঁবুর কাপড় কেটে ঢুকে পড়ছে ভেতরে। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কর্মীরা জানিয়েছেন, অনেক শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় কামড়ে দিয়েছে ইঁদুর। কোনো কোনো পরিবার রাতভর জেগে থাকে শুধু সন্তানদের নিরাপদ রাখার জন্য। অনেকেই খাবার ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাতে ঝুলিয়ে রাখছেন তাঁবুর ছাদে।
আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হলো, বহু এলাকায় এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে মরদেহ। অনেক পরিবার জানেই না তাঁদের স্বজন জীবিত নাকি মৃত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দুর্গন্ধ। রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে প্রতিদিন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ত্রাণ পৌঁছাতে নানা বাধা থাকায় আরও খারাপ হচ্ছে পরিস্থিতি। বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট কাটেনি। ফলে যুদ্ধবিরতির বহু মাস পরও গাজার মানুষের কাছে শান্তি এখনো শুধু একটি শব্দ। বাস্তবে তাঁদের প্রতিটি সকাল শুরু হচ্ছে নতুন অনিশ্চয়তা, নতুন ভয় ও বেঁচে থাকার আরেকটি কঠিন লড়াই নিয়ে।
আরটিভি/এআর



