পনেরো পোষ্যের স্কুলবাস, গন্তব্য খেলার মাঠ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬ , ১১:০৫ এএম


পনেরো পোষ্যের স্কুলবাস, গন্তব্য খেলার মাঠ
ছবি: সংগৃহীত

সকালে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় উজ্জ্বল হলুদ বাস। দরজা খুলতেই লেজ নাড়তে নাড়তে একে একে উঠে পড়ে যাত্রীরা। কেউ জানালার ধারের আসনে, কেউ আবার ছুটে যায় নিজের পছন্দের জায়গায়। তবে এই বাসে কোনো মানুষ যাত্রী নেই–সবাই পোষা কুকুর।

ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের লিডস শহরে কুকুরদের জন্য এমন অভিনব বাস চালান ৫৬ বছর বয়সী শ্যারন টেলফোর্ড। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৫টি কুকুরকে বাড়ি থেকে তুলে একটি সুরক্ষিত ব্যক্তিগত খেলাঘরে নিয়ে যান তিনি। সেখানে দৌড়ঝাঁপ, শরীরচর্চা এবং অন্য কুকুরের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায় পোষ্যগুলো।

বাসটির নাম ‘বিলিজ বাস’। লরা মোহান নামের এক নারী তার পোষা কুকুর বিলির নামেই এই সেবা চালু করেন। সাধারণ কুকুর পরিচর্যাকেন্দ্রে বিলি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। আবার মাত্র এক ঘণ্টার হাঁটাচলাতেও তার শরীরচর্চা ও মেলামেশার প্রয়োজন পূরণ হচ্ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কুকুরদের জন্য আলাদা বাস ও খেলাঘরের পরিকল্পনা লরার।

শ্যারনের কাছে বাস চালানো নতুন কিছু নয়। প্রায় ২৫ বছর তিনি শিশুদের জন্য তৈরি ভ্রাম্যমাণ খেলাঘরের দ্বিতল বাস চালিয়েছেন। ১৯৯৫ সালে পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের অটলিতে শিশুদের একটি খেলাঘরও চালু করেছিলেন তিনি। পরে পুরোনো একটি দ্বিতল বাস কিনে সেটিকে খেলাধুলার ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রে রূপ দেন।

তবে শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। বাস চালানোর প্রথম প্রশিক্ষণে ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন শ্যারন। ছয় মাসের মধ্যেই অবশ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর বিয়ে, জন্মদিন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিশুদের নিয়ে বাস চালিয়েছেন দীর্ঘদিন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে সেই বাস বিক্রি করার পর নতুন কাজের খোঁজে ছিলেন তিনি। তখনই কুকুরপ্রেমী চালক চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন তার নজরে পড়ে। সাক্ষাৎকার ও পরীক্ষামূলক দায়িত্বের পর ওই বছরের অক্টোবরে ‘বিলিজ বাস’ চালানো শুরু করেন শ্যারন।

প্রতিদিন সকাল ১০টায় বাস পরীক্ষা করে শ্যারনের কাজ শুরু। এরপর লিডস শহরের প্রায় ১০ মাইল এলাকার মধ্যে থাকা কুকুরগুলোকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়।

কুকুরদের সুবিধার জন্য বাসের সাধারণ আসন সরিয়ে বসানো হয়েছে উঁচু আলাদা কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে রয়েছে নিরাপত্তাবন্ধনী, শরীরবন্ধনী ও পানির পাত্র। জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বাসে ওঠার আগে প্রতিটি কুকুরকে পরীক্ষামূলকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন কর্মীরা। অন্য কুকুরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে কিনা, সেটিও যাচাই করা হয়। যাত্রার সময় প্রতি ছয়টি কুকুরের দায়িত্বে থাকেন একজন কর্মী। তারা পোষ্যগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজন হলে শান্ত রাখেন।

প্রতিদিন একই পথে যাতায়াত করতে করতে বাসের নিয়মও শিখে নিয়েছে কুকুরগুলো। খেলাঘরের কাছাকাছি গিয়ে বাসটি একটি বিশেষ রাস্তা ও গবাদিপশু আটকানোর লোহার ফটক পার হলেই শুরু হয় ঘেউঘেউ। গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দ যেন আর ধরে রাখা যায় না।

কয়েকটি কুকুরের রয়েছে নির্দিষ্ট পছন্দের আসন। সামনের সারিতে নিজের জায়গায় অন্য কাউকে দেখলে একটি পুডল কুকুর রীতিমতো প্রতিবাদ শুরু করে। আসনটি খালি না হওয়া পর্যন্ত অন্য কুকুরটির দিকে তাকিয়ে ঘেউঘেউ চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত তাকেই পছন্দের জায়গাটি ছেড়ে দেন কর্মীরা।

বাস থেকে নিরাপদে নামানোর জন্য পাশে একটি বিশেষ সুড়ঙ্গ জুড়ে দেওয়া হয়। সেই পথ ধরে কুকুরগুলো সরাসরি ঘেরা খেলাঘরে পৌঁছে যায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবাধে দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি দোলনা, ভারসাম্যের পাটাতন ও লাফানোর বিশেষ মঞ্চে খেলার সুযোগ।

খেলাধুলা শেষে বাসে ফিরে কুকুরগুলোর জন্য থাকে খাবার ও বিশেষ পানীয়। সকালের হইচই অবশ্য ফেরার পথে আর দেখা যায় না। ক্লান্ত কুকুরগুলোর অধিকাংশ তখন চুপচাপ বসে থাকে কিংবা ঘুমিয়ে পড়ে।

শ্যারনের মতে, ফেরার পথে বাস যত শান্ত থাকে, ততই বোঝা যায় যে কুকুরগুলোর দিনটি ভালো কেটেছে।

দৈনন্দিন যাত্রার বাইরেও ব্যতিক্রমী দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ব্র্যাডফোর্ডের ইলক্লি উৎসবের শোভাযাত্রায় তার বাসে ছিল ১০টি কুকুর, আর পেছনে হেঁটেছিল আরও ৩০টি। একটি চলচ্চিত্রের প্রচারণায় ১০টি কুকুরকে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও পেয়েছিলেন শ্যারন।

‘বিলিজ বাস’ কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের আরও এলাকায় এই সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রতিটি কুকুরকে অন্তত তিন ঘণ্টা খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও অন্য কুকুরের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ দেওয়া হয়।

২৫ বছর শিশুদের নিয়ে বাস চালানোর পর এখন কুকুরের ঘেউঘেউয়ে কোনো বিরক্তি নেই শ্যারনের। বরং হলুদ বাসভর্তি পোষা কুকুর নিয়ে শহরের পথে বেরোলেই পথচারীদের হাসি, হাত নাড়া আর ছবি তোলার ব্যস্ততা।

আরও পড়ুন

কখনও কুকুরদের বাস চালাবেন–এমন কল্পনাও করেননি শ্যারন। এখন অবশ্য এই কাজ ছেড়ে অন্য কিছু করার ইচ্ছা নেই তার।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission