অনলাইনে সাশ্রয়ীমূল্যে শুক্রাণু বা স্পার্ম খুঁজতে গিয়ে ভয়ংকর ফাঁদে পড়ছেন নারীরা; অনেককেই হতে হচ্ছে যৌন হয়রানির শিকার।
ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে এমনই তথ্য তুলে ধরেছে বিবিসি ওয়েলস-এর এক অনুসন্ধানী দল।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৈধ উপায়ে বন্ধ্যাত্ব বা ফার্টিলিটি চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে অনেক ব্রিটিশ নারী বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে বিকল্প খুঁজছেন, যা তাদের সামাজিক বাস্তবতা। ফলে বড় ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বাজার তৈরি হচ্ছে, যেখানে কেউ কেউ শুক্রাণু খোঁজার জন্য ‘টিন্ডার ফর স্পার্ম’-এর মতো ওয়েবসাইটের দিকেও ঝুঁকছেন।
অনুসন্ধানী দলটি অনলাইনে শুক্রাণুর বিজ্ঞাপন দেওয়া একজন ব্যক্তির কাছ থেকে ডেলিভারির শর্তে ১০০ পাউন্ডের বিনিময়ে নমুনা সংগ্রহ করেছে। ওই ব্যক্তি অনলাইনে তার এ নমুনাকে ‘বেবি ব্যাটার’ হিসেবে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন এবং সেটি টমেটো পাতার হিমায়িত এক কার্টনের সঙ্গে এক বাক্সে ভরে পাঠিয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যের ফার্টিলিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, নারীরা এখানে ‘শিকারী ও সুবিধাবাদী দাতাদের মাধ্যমে নিপীড়নের’ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিবিসি দেখেছে অনলাইনে শুক্রাণু সংগ্রহ করা অনেক সহজ এবং সেখানে সেবা দিতে আগ্রহী পুরুষের কোনো অভাবও নেই।
অনলাইনের এক বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ডাকযোগে ডেলিভারির জন্য ‘জো ডোনার’ নামের এক ব্যক্তির ওপর ‘ভরসা’ করতে। ‘জো ডোনার’ একজন অতি-সক্রিয় দাতা এবং তার দাবি, সরাসরি শারীরিক সম্পর্ক ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তার ১৮০টি সন্তান রয়েছে।
অনিয়ন্ত্রিত শুক্রাণু দানের বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করতে কার্ডিফের এক ফ্যামিলি কোর্টের বিচারক ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি জনস্বার্থে এ ব্যক্তির আসল নাম ‘রবার্ট অ্যালবন’ বলে প্রকাশ করেছেন। এক ছদ্মনাম ব্যবহার করে বিবিসি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার কাছ থেকে পরদিনই ডেলিভারি নিশ্চিত করতে বিবিসির কেবল কয়েকটি ইমেইল ও সংক্ষিপ্ত এক ফোন কলের প্রয়োজন হয়েছে।
এক্ষেত্রে বিবিসির পরিচয় যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজন মনে করেননি ওই ব্যক্তি। এমনকি তিনি এমন কোনো হেলথ চেক বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্টও নিজে থেকে বিবিসিকে দেখাননি। তিনি ডাকযোগের মাধ্যমে নগদ ১০০ পাউন্ড চার্জ করেছিলেন এবং এক সিরিঞ্জ করে শুক্রাণু পাঠিয়েছিলেন, যা ঠাণ্ডা রাখার জন্য বরফের টুকরার বদলে টমেটো পাতার বক্স ব্যবহার করেছেন।
নমুনাটি পাওয়ার চার ঘণ্টা পর লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিকে তা পরীক্ষা করিয়েছে বিবিসি। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এর ভেতরের সব শুক্রাণু কোষ মৃত।
শুক্রাণু খুঁজছেন এমন নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অ্যালবন এবং আরও শত শত পুরুষ ফেইসবুক ব্যবহার করছেন, সেখানকার কিছু কিছু দলের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার পর্যন্ত।
এ ধরনের এক ডোনার দলে যোগ দিয়ে বিবিসি দেখেছে, সেখানে কিছু মেসেজ বেশ আন্তরিক হলেও অনেকেই সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব, নমুনার জন্য অর্থ দাবি, অন্তরঙ্গ ছবি ও দেখা করার ব্যবস্থা করতে অনবরত মেসেজ পাঠান।
কিছু পুরুষ ক্রমাগত শারীরিক সম্পর্কের জন্য চাপ দিতে থাকে এবং বোঝানোর চেষ্টা করে, এটাই গর্ভধারণের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায় হবে।
ওই দলে একজন নারীকে পোস্টে সতর্ক করতে দেখা গিয়েছে, যেখানে তিনি লিখেছেন, নর্থ ওয়েলসের এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি শুক্রাণু নিয়েছিলেন। তবে পরে জানতে পারেন যে ওই ব্যক্তি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী।
‘হিউম্যান ফার্টিলাইজেশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি অথরিটি’ বা এইচএফইএ বলেছে, তাদের লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোম্পানির বাইরে যে কোনো ধরনের শুক্রাণু দানই অনিয়ন্ত্রিত ও যুক্তরাজ্যের আইন অনুসারে তা ফৌজদারি অপরাধ।
সাউথ ওয়েলসের তিয়ানা ও তার স্ত্রী নিকিও এ অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছিলেন। তারা বলেছেন, এনএইচএস থেকে সরকারি অর্থায়নের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য তারা ছিলেন না, আর বেসরকারিভাবে এ চিকিৎসা করানো তাদের জন্য ব্যয়বহুল।
তিয়ানা বলেছেন, ‘এখানে আপনি এমন কিছু অদ্ভুত মানুষের মুখোমুখি হবেন যারা সম্পূর্ণ ভুল ও অনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব কাজ করছে।’
এ দম্পতি কৃত্রিম প্রজনন খুঁজছিলেন তবে তারা বলেছেন, পুরুষেরা প্রায়শই সবচেয়ে ভালো উপায় হিসেবে সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের পরামর্শ দিতেন।
তিয়ানা ও নিকি শেষ পর্যন্ত ‘কো-প্যারেন্টিং’ নামের ওয়েবসাইটে এমন একজন দাতার সন্ধান পান যাকে তাদের নিরাপদ মনে হয়েছে। পরবর্তীতে তারা একটি চুক্তি করেন, যাতে যোগাযোগ ও অভিভাবকের অধিকার সংক্রান্ত পরিকল্পনার বিষয়ে সব পক্ষই স্পষ্ট ধারণা পায়।
তবে, এমনটা কোনো আইনি চুক্তি নয়। তিয়ানা বলেছেন, ভবিষ্যতে এমন একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়, দাতা ভবিষ্যতে এসে সন্তানের ওপর নিজের দাবি করে আমাদের আদালতের মুখোমুখি করতে পারেন। তবে আমি মনে করি এমনটা বন্ধের জন্য আমরা সম্ভাব্য সবকিছুই করে রেখেছি এবং আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তিনি আমাদের সঙ্গে এমন করবেন না।
এ অনিয়ন্ত্রিত দাতারা বিভিন্ন উপায়ে তাদের সেবা দিয়ে থাকে; যার মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়, আবার কেউ কেউ কৃত্রিম প্রজননের জন্য বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উড়ে যাওয়ার যাতায়াত খরচ দাবি করে বসে।
২৫ বছর বয়সী ড্যানিয়েল বায়েন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শুক্রাণু দান করতে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে তিনি যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। তার দাবি, এ সফরের ফলে চারটি শিশুর জন্ম হয়েছে।
বিবিসি তিন দিন ধরে ড্যানিয়েলের তথ্যচিত্র ধারণ করেছে। ড্যানিয়েল তার অনলাইন ভিডিওগুলোতে নিজেকে একাধারে ‘সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া দাতা’ ও ‘অলাভজনক’ উদ্দেশ্যে কাজ করা ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেছেন।
তবে, তার ভাষ্য, যুক্তরাজ্যের গ্রাহকদের কাছ থেকে তিনি কেবল যাতায়াত খরচই চেয়েছেন। তবে অন্য জায়গায় ডোনেশনের জন্য তাকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত অফার করা হয়েছিল বলে দাবি করেন ড্যানিয়েল।
যাদের খরচ করার মতো অর্থ আছে, তাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, অন্য লোকে কী ভাবল তা নিয়ে আমি সত্যিই পরোয়া করি না। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করি, সেসব শিশু ও পরিবারের জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো আমি কেবল সেটাই ভাবি।
নিজেকে একজন ‘ওপেন ডোনার’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ড্যানিয়েল বলেছেন, অবশ্যই, আপনার স্বাস্থ্য ও এসডিআই বা যৌনবাহিত রোগ পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মিথ্যা বলা উচিত নয়। তবে আপনি কোথায় কাজ করেন, কী করেন বা গ্রহীতাদের মামলা করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়াটা একদম ঠিক আছে। যেমন ধরুন আপনার পুরো নাম বা ঠিকানা।
ড্যানিয়েলের দাবি, যুক্তরাজ্যে শুক্রাণু দেওয়ার সময় তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেননি।
যুক্তরাজ্যের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিভিন্ন ক্লিনিক এইচএফইএ-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে বিশেষ এক পেইজ তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ এ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
এইচএফইএ বলেছে, তারা বেশ কয়েকজন অতি-সক্রিয় অনিয়ন্ত্রিত দাতাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। মানুষের ব্যবহারের জন্য ডিম্বাণু বা শুক্রাণু ‘ব্যবহার, সংরক্ষণ, সংগ্রহ, পরীক্ষা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ’ করা সম্পূর্ণ অবৈধ, যদি না এসব কাজ এইচএফই-এর লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোনো ক্লিনিকে হয়।
এইচএফইএ-এর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর ক্লেয়ার এটিংহাউসেন বলেছেন, আইন একেবারে স্পষ্ট যে, এইচএফইএ-এর লাইসেন্স ছাড়া আপনি শুক্রাণু প্রক্রিয়াজাত বা বিতরণ করতে পারবেন না। ডাকযোগে পাঠিয়ে সে আসলে এ আইনটিই লঙ্ঘন করছেন ড্যানিয়েল।
এর জবাবে অ্যালবন বলেছেন, এসব নিয়ম তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ তার ধারণা, ব্যক্তিগতভাবে শুক্রাণু দান করা, যার মধ্যে এর জন্য চার্জ করাও অন্তর্ভুক্ত তা সম্পূর্ণ আইনি ও বৈধ। তিনি কোনো অসহায় বা দুর্বল নারীর জন্য ‘সরাসরি কোনো হুমকি’ নন।
এটিংহাউসেন বলেছেন, ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটা ‘আইন ভাঙার এ প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করে তুলছে’। মার্চে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের একটি সিলেক্ট কমিটিতেও তিনি এ বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন।
এইচএফইএ বলেছে, তারা এ বিষয়ে সরাসরি মেটার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। তবে বাস্তবতার নিরিখে এটিংহাউসেন বলেছেন, এ ধরনের সামাজিক মাধ্যম দলগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে এ অনৈতিক চর্চাটি হয়ত অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হবে।
তিনি নারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, এসব দাতার মধ্যে কেউ কেউ কেবল ন্যাচারাল ইনসেমিনেশন বা সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে শুক্রাণু দানের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, যা কিছু ক্ষেত্রে নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাদের শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য বা প্ররোচিত করার শামিল।
ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটা বলেছে, তারা ‘তাদের সঙ্গে শেয়ার করা যে কোনো গ্রুপ বা পোস্ট পর্যালোচনা করবে এবং তাদের নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে এমন কনটেন্ট সরিয়ে দেবে’। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর জন্য আমাদের নির্দিষ্ট রিপোর্টিং প্রক্রিয়া রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা এমন কনটেন্ট চিহ্নিত করতে পারে, যা হয়ত আমাদের পলিসি ভাঙছে না তবে স্থানীয় আইন লঙ্ঘন করছে। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি।
আরটিভি/এসএইচএম




