একসময় বই পড়া ছিল অবসর কাটানোর অন্যতম প্রিয় উপায়। কিন্তু ব্যস্ত জীবন, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার আর মুঠোফোনের আকর্ষণে অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস। এবার সেই অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নীরবে বই পড়ার আড্ডা (সাইলেন্ট রিডিং ক্লাব)।
একটি ঘরে বসে অনেক মানুষ একসঙ্গে বই পড়ছেন, কিন্তু কেউ কথা বলছেন না। চারপাশে শুধু পাতার শব্দ। কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হচ্ছে গল্প, পরিচয় আর বন্ধুত্বের সময়। এমন আয়োজনই এখন নতুন করে মানুষকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনছে।
নীরবে বই পড়ার আড্ডায় মিলছে নতুন বন্ধু
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার একটি ঐতিহাসিক বাড়িতে এমনই এক আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন অনেক বইপ্রেমী মানুষ। শুরুতে সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, পরিচিত হচ্ছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পুরো পরিবেশ বদলে যায়। সবাই নীরবে নিজের পছন্দের বই পড়তে শুরু করেন।
পরে আবার শুরু হয় আলোচনা ও আড্ডা। আয়োজকদের মতে, বই এখানে শুধু পড়ার বিষয় নয়, বরং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের একটি মাধ্যম।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে এমন আয়োজন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবসর সময়ের বই পড়ার অভ্যাস মানুষের মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিতে সাহায্য করে। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ ও অস্থিরতার মধ্যে কিছু সময় বই পড়া মনকে শান্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক বছরে অবসরে বই পড়ার প্রবণতা কমেছে। তবে নতুন ধরনের বই পড়ার আয়োজন, বই নিয়ে আলোচনা এবং অনলাইনভিত্তিক বইপ্রেমীদের বিভিন্ন কার্যক্রম আবারও মানুষকে পড়ার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনছে।
বই পড়লে মস্তিষ্কে কী উপকার হয়?
গবেষণা বলছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মানুষের জ্ঞান বাড়ায়, শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে এবং কল্পনাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত বই পড়া স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে। পাশাপাশি বই পড়া মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশার অনুভূতি কমাতে সাহায্য করে এবং ঘুমের মানও ভালো করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বই পড়া শুধু একার অভ্যাস নয়, এটি মানুষের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতাও বাড়ায়। অন্য মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার গল্প পড়ার মাধ্যমে মানুষ আরও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
মুঠোফোনের বদলে বইয়ে ফিরছেন অনেকে
বর্তমান সময়ে দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ব্যবহার মানুষের মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্য মানুষের মস্তিষ্ককে সবসময় ব্যস্ত রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বই পড়া এই অতিরিক্ত উত্তেজনা থেকে কিছুটা বিরতি দেয়। তাই অনেকেই রাতে ঘুমানোর আগে মুঠোফোন ব্যবহারের বদলে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করছেন।
কীভাবে শুরু করবেন বই পড়ার অভ্যাস?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বই পড়ার জন্য বড় কোনো লক্ষ্য ঠিক করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন অল্প সময় দিয়েও শুরু করা যায়।
নিজের আগ্রহের বিষয় থেকে বই বেছে নেওয়া উচিত। কোনো বই ভালো না লাগলে সেটি শেষ করতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতাও নেই।
বই বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কৌতূহলকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যে বিষয়ে আগ্রহ আছে, সেই বিষয় নিয়ে পড়া শুরু করলেই অভ্যাস তৈরি করা সহজ হয়।
বই পড়ার আনন্দই সবচেয়ে জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বই পড়াকে কোনো কঠিন নিয়মের মধ্যে আটকে না রেখে আনন্দের বিষয় হিসেবে নিতে হবে।
কারণ বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য শুধু সময় পূরণ নয়, বরং নিজের মনকে শান্ত করা, নতুন কিছু শেখা এবং জীবনের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করা।
তাই ব্যস্ত জীবনের মাঝে প্রতিদিন একটু সময় বইয়ের জন্য রাখলে তা হতে পারে মস্তিষ্ক ও মনের জন্য এক ধরনের প্রশান্তির বিরতি।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ




