স্ট্রোক নাকি সাধারণ জ্ঞান হারানো, বুঝবেন যেভাবে

লাইফস্টাইল ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬ , ১০:২৯ পিএম


স্ট্রোক নাকি সাধারণ জ্ঞান হারানো, বুঝবেন যেভাবে
ছবি: সংগৃহীত

গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার ঝুঁকি। 

চিকিৎসকদের মতে, এই তীব্র গরমে রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়া (ফেইন্টিং) অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। তবে কোনো প্রবীণ ব্যক্তি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তা কেবলই গরমের কারণে সাধারণ ফেইন্টিং, নাকি স্ট্রোক—তা দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। 

সাধারণ জ্ঞান হারানো সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসায় দ্রুত নিরাময় সম্ভব হলেও, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতিসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। 

বয়স্কদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের লক্ষণ কেন এড়িয়ে যাওয়া হয়?

বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, প্রবীণদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। 

‘দ্য সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টু রিডিউস হিট রিস্ক’ সংস্থার মতে, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের ব্যক্তিরা তীব্র তাপজনিত ক্লান্তির (হিট এক্সহশেন) উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বয়স্কদের দুর্বলতা বা জ্ঞান হারানোকে কেবলই গরমের ক্লান্তি ভেবে ভুল করেন, যার ফলে স্ট্রোকের মতো মারাত্মক রোগের লক্ষণগুলো ঢাকা পড়ে যায়। 

ফেইন্টিং বনাম স্ট্রোক: মূল পার্থক্য 

সাধারণ জ্ঞান হারানো 

১. মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া (পানিশূন্যতা, গরম বা কম রক্তশর্করার কারণে)। 

২. সাময়িক ব্ল্যাকআউট বা অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান হারানো এবং দ্রুত চেতনা ফিরে পাওয়া। 

৩. সাধারণত কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয় না (পড়ে গিয়ে চোট পাওয়া ছাড়া)। 

স্ট্রোক

১. মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে রক্তপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হওয়া। 

২. জ্ঞান হারানোর পূর্বেই দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়া। 

৩. সময়মতো চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী ব্রেন ড্যামেজ বা পক্ষাঘাত হতে পারে। 


আরও পড়ুন
কানের ভেতর ভনভন শব্দ, কী এই ‘গ্লোবাল হাম’?
কানের ভেতর ভনভন শব্দ, কী এই ‘গ্লোবাল হাম’?
সাধারণ জ্ঞান হারানোর পূর্বলক্ষণসমূহ 

যদি এটি সাধারণ জ্ঞান হারানো হয়ে থাকে, তবে অচেতন হওয়ার আগে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়: 

> হঠাৎ মাথা ঘোরানো বা ভারসাম্য বজায় রাখতে কষ্ট হওয়া।
> হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়ার কারণে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
> রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
> চোখের সামনে অন্ধকার দেখা বা ‘টানেল ভিশন’ হওয়া। 
> শুইয়ে দেওয়ার পর দ্রুত জ্ঞান ফিরে আসা। 
> স্ট্রোকের মারাত্মক লক্ষণসমূহ

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রবীণদের মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি হেল্পলাইনে যোগাযোগ করতে হবে: 

মুখের অবয়ব বেঁকে যাওয়া: হঠাৎ মুখের একপাশ ঝুলে পড়া।

অসংলগ্ন কথা: কথা জড়িয়ে যাওয়া বা স্পষ্ট করে বলতে না পারা।

শরীরের একপাশে দুর্বলতা: শরীরের যেকোনো একদিকের হাত বা পা অবশ হয়ে যাওয়া এবং তা নাড়াতে না পারা।

হঠাৎ বিভ্রান্তি: চিন্তাভাবনা গুছিয়ে উঠতে না পারা বা তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি। 

দৃষ্টিশক্তি হ্রাস: অপটিক নার্ভে সংকেত বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া।

হাঁটতে অসুবিধা ও তীব্র মাথা ঘোরানো: শরীরের নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।

হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা: কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হওয়া। 

জীবন রক্ষাকারী ৬০ সেকেন্ডের ‘এফএএসটি’ (FAST) পরীক্ষা 

কারো স্ট্রোক হচ্ছে কিনা তা মাত্র ১ মিনিটে নিশ্চিত হতে ‘এফএএসটি’ পদ্ধতিটি প্রয়োগ করুন:

F (Face - মুখ): আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসতে বলুন। দেখুন মুখের একপাশ ঝুলে যাচ্ছে কিনা।

A (Arms - হাত): তাকে দুটি হাত ওপরে তুলতে বলুন। যদি একটি হাত ওপরে না উঠে নিচের দিকে নেমে যায়, তবে তা স্ট্রোকের লক্ষণ।

S (Speech - কথা): তাকে একটি সহজ বাক্য পুনরাবৃত্তি করতে বলুন। কথা জড়িয়ে গেলে বা অস্পষ্ট শোনালে বুঝতে হবে স্ট্রোক হচ্ছে।

T (Time - সময়): উপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা সেবা বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। 

কেন গরমের দিনে বয়স্কদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে? 

জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড ফিজিওলজি-তে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মের উত্তাপ এবং আগে থেকে থাকা কিছু রোগ যৌথভাবে বয়স্কদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

> তীব্র পানিশূন্যতা 
> রক্ত সঞ্চালন হ্রাস পাওয়া এবং রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া
> উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস
> হৃদরোগ এবং হিট স্ট্রেস 
> উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন যারা

৬০ বছরের ঊর্ধ্বের প্রবীণ ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগী, হৃদরোগী, ধূমপায়ী এবং যারা পূর্বে স্ট্রোক করেছেন—তারা এই গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। 

তাই বয়স্ক কেউ হঠাৎ পড়ে গেলে প্রথমে তার পালস ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করুন এবং ‘এফএএসটি’ টেস্ট নিন। স্ট্রোক সন্দেহ হলে রোগীকে কোনো অবস্থাতেই খাবার বা পানি দেবেন না, কারণ এই সময় তাদের গিলন প্রক্রিয়া অকেজো থাকে, যা শ্বাসনালী বন্ধ করে দমবন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। রোগীকে ঠাণ্ডা ও আরামদায়ক স্থানে রেখে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। 

আরটিভি/এমএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission