বাংলাদেশে প্রতি বছর বহু মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপের বিষের চেয়েও অনেক সময় ভুল প্রাথমিক চিকিৎসা, কুসংস্কার এবং আতঙ্ক রোগীর জীবনকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
সাপে কামড়ানোর পর কী করা উচিত এবং কোন ভুলগুলো একেবারেই করা যাবে না— তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, সাপে কামড়ানোর পর ওঝা, গুণীন বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে ঝাড়ফুঁক বা মন্ত্র পড়ে সাপের বিষ নামানো সম্ভব নয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অনেকে কামড়ের স্থানে ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কেটে রক্ত বের করার চেষ্টা করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে।
একইভাবে মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করাও সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, যে ব্যক্তি বিষ চুষছেন, তাঁর মুখে বা মাড়িতে ক্ষুদ্র কোনো ক্ষত থাকলে বিষ তাঁর শরীরেও প্রবেশ করতে পারে।
আক্রান্ত স্থানের ওপরে দড়ি, তার বা কাপড় দিয়ে খুব শক্ত করে বেঁধে দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। অতিরিক্ত চাপের কারণে ওই অঙ্গে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গ নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
ক্ষতস্থানে বরফ দেওয়া, আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া কিংবা পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, চুন বা ভেষজ লতাপাতা বাটা লাগানোও উচিত নয়।
চিকিৎসকদের মতে, সাপে কামড়ানোর পর রোগীর আতঙ্ক কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে শরীরে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, অধিকাংশ সাপই বিষহীন এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব।
যদি পায়ে সাপ কামড়ায়, তাহলে রোগীকে হাঁটতে দেওয়া যাবে না। আক্রান্ত হাত বা পা যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে। প্রয়োজনে কাঠের টুকরা বা শক্ত স্কেল দিয়ে কাপড়ের সাহায্যে আলতোভাবে বেঁধে অঙ্গটি স্থির রাখা যেতে পারে, যেমন হাড় ভাঙলে করা হয়।
সাপে কামড়ানোর পর আক্রান্ত স্থানে দ্রুত ফোলা দেখা দিতে পারে। তাই হাত বা পায়ে থাকা আংটি, ঘড়ি, চুড়ি, টাইট জুতা বা মোজা দ্রুত খুলে ফেলতে হবে, যাতে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি না হয়।
পরিষ্কার পানি থাকলে ক্ষতস্থান আলতোভাবে ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই ঘষাঘষি করা যাবে না।
সম্ভব হলে নিরাপদ দূরত্ব থেকে সাপটির রং, আকার বা বৈশিষ্ট্য মনে রাখার চেষ্টা করুন কিংবা ছবি তুলে রাখুন। এতে চিকিৎসকদের বিষাক্ত সাপ শনাক্ত করতে সুবিধা হতে পারে। তবে সাপ ধরার চেষ্টা করা বা এর পেছনে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ধরনের বিলম্ব না করে রোগীকে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে হবে। সাপের বিষের কার্যকর চিকিৎসা হলো অ্যান্টিভেনম, যা সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
চিকিৎসকদের মতে, সাপে কামড়ানোর পর প্রথম এক ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত ও দ্রুত চিকিৎসা একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরটিভি/এমএইচজে




