পৃথিবীতে ১০ মহাবিপদ ডেকে আনছে ‘সুপার’ এল নিনো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ , ০৭:৫৮ পিএম


পৃথিবীতে ১০ মহাবিপদ ডেকে আনছে ‘সুপার’ এল নিনো
প্রতীকী ছবি

তীব্র খরা, দাবানল আর অতিবৃষ্টির শঙ্কা জাগিয়ে পৃথিবীর বুকে ধেয়ে আসছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’। জলবায়ুর সম্ভাব্য এই ভয়ংকর অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে আগামী নভেম্বর কিংবা তারও বেশি সময় পর্যন্ত। এরই মধ্যে এই ‘এল নিনো’ ঘিরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। 

আর বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী এল নিনোর তাণ্ডব চালানোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। এ অবস্থায় যদি সুপার এল নিনো সক্রিয় হয়, তাহলে আরও খারাপ হতে পারে পরিস্থিতি। 

প্রকৃতির এক বিধ্বংসী রূপের নাম ‘এল নিনো’। এটি এমন একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ফিরে আসে। এর স্থায়িত্ব হয় প্রায় নয় থেকে ১২ মাস। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

এই এল নিনোর প্রভাব শুধু জলবায়ুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ চেইনকে ঝুঁকিতে ফেলে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাত হানে এটি। জলবায়ুর এই বিশেষ পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক অর্থনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে আরও সংকটের মুখে। 

সম্ভাব্য এই সুপার এল নিনোর প্রভাবে চোখ রাঙাতে থাকা ১০ মহাবিপদ সম্পর্কে সচেতন করেছেন যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ের অধ্যাপক বেঞ্জামিন সেলউইন। এগুলো হলো— 

১. তীব্র খরা

বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলো খরার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাব-সাহারান আফ্রিকার কিছু অংশে এল নিনোর কারণে শস্যের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়, যা খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবার এই এল নিনো এমন এক সময়ে আসছে যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যে একটি বড় সার সংকট চলছে। ফলে তীব্র ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

২. বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ চেইনে বড় ধাক্কা

বিশ্বের মানুষের দৈনিক ক্যালরি চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে মাত্র চারটি ফসল—গম, ধান, ভুট্টা এবং সয়াবিন থেকে। ভুট্টা এবং ধান এল নিনোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। খরার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিলের মতো প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে এগুলোর ফলন কমে যায়। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও চীনের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশে গম এবং ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় সয়াবিন উৎপাদন ব্যাহত হয়।

আরও পড়ুন

৩. দাবানলের ঝুঁকি

এল নিনো কিছু অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দক্ষিণ আমেরিকায় এটি বর্ষাকালের বৃষ্টিপাত কমিয়ে দেয়, যার ফলে গাছপালা ও বনাঞ্চল শুষ্ক এবং সহজেই অগ্নিগ্রাহী হয়ে ওঠে। ২০১৬ এবং ২০২৪ সালে ব্রাজিলে ভয়াবহ দাবানলে লাখ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, যা আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক দশক সময় লাগবে।

৪. অতিবৃষ্টি ও বন্যা

এল নিনোর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকা, হর্ন অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র ঝড় ও অতিবৃষ্টির কারণে মাটি পানি শোষণ করতে পারে না। ফলে পানি শুষে নেওয়ার বদলে তা ওপর দিয়ে বয়ে যায় (রান-অফ) এবং বৃষ্টির মধ্যবর্তী দীর্ঘ খরা দিনগুলোতে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যায়।

৫. কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি

অতিরিক্ত গরমের কারণে বিশ্বের কিছু অংশে কয়লার ব্যবহার রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যেতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের সৃষ্টি করে। ফলে এসি বা এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের চাহিদা বহুগুণ বাড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর ভারত ৭০ শতাংশ এবং চীন প্রায় ৫৫ শতাংশ নির্ভরশীল।

৬. বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা গ্রিড বিকল

খরা বা অনাবৃষ্টির কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা বিদ্যুৎ গ্রিড বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন—কলম্বিয়া তার মোট বিদ্যুতের ৬৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎ থেকে পায়। ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় দেশটিতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায় এবং ব্ল্যাকআউট বা লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। ১৯৯২ সালের এল নিনোর সময় কলম্বিয়া সরকারকে বিদ্যুৎ রেশনিং করতে হয়েছিল।

৭. মাছের সংখ্যা হ্রাস

এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে নিচ থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিকর পানি ওপরে উঠে আসার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের মতো কণা উদ্ভিদের পুষ্টি কমে যায় এবং অ্যানচোভি ও সার্ডিনের মতো ছোট মাছ পর্যাপ্ত খাবার পায় না। বড় শিকারি মাছগুলো তখন খাবারের খোঁজে অন্যত্র চলে যায়। ক্যালিফোর্নিয়া, মেক্সিকো, পেরু, ইকুয়েডর থেকে শুরু করে পাপুয়া নিউগিনি ও মাইক্রোনেশিয়ার মৎস্য শিল্প এর ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে।

৮. ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা

চরম আবহাওয়া বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে ফসলের উর্বরতা কমে যায়, ফলে কৃষকরা জমিতে বেশি সার ব্যবহার করতে বাধ্য হন। বর্তমান বৈশ্বিক সার সংকটের প্রেক্ষাপটে চীন, কিছু উপসাগরীয় দেশ এবং আলজেরিয়া নিজেদের সার রপ্তানি সীমিত করতে সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ করেছে। রাশিয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের (সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান) রপ্তানি লাইসেন্স স্থগিত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে সাধারণ একটি কৃষি উপকরণ এখন বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন বিরোধের কারণ হয়ে উঠছে।

৯. হিট স্ট্রোক ও গরমজনিত অসুস্থতা

তীব্র গরমের প্রভাব সমাজে সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। যারা বাইরে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন, যেমন—কৃষি ও নির্মাণ শ্রমিক, তাদের হিট স্ট্রোক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গরমের মৌসুমে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, যা লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

১০. গৃহযুদ্ধ ও সামাজিক সংঘাত

ফসলের কম ফলন এবং দুর্বল অর্থনীতি প্রায়শই সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনোর বছরগুলোতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সম্ভাবনা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৯৫০ সালের পর থেকে বিশ্বের প্রায় ২১ শতাংশ সংঘাত এই ধরনের জলবায়ুগত পরিবর্তনের সাথে জড়িত। যেমন সুদানের দারফুরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও ফসলহানি সম্পদের সংকট তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

অধ্যাপক বেঞ্জামিন সেলউইনের মতে, সম্ভাব্য এই পরিবেশগত ও সামাজিক সংকট থেকে মুক্তির দুটি উপায়ও রয়েছে। এগুলো হলো— 

নবায়নযোগ্য শক্তি: জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করার প্রযুক্তি ও জ্ঞান আমাদের রয়েছে। তবে, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন, জ্বালানি এবং বাণিজ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না করলে এই সমাধানগুলোর সুফল গরিব দেশগুলো পাবে না।

টেকসই কৃষিব্যবস্থা: এমন প্রতিরোধী কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে। তবে রাসায়নিক-নির্ভর এবং কেবল রপ্তানিমুখী কৃষিব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে বড় ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রূপান্তর প্রয়োজন।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission