খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সম্প্রতি যেন অন্য রূপ ধারণ করেছে। যে ক্যাম্পাস প্রতিদিন মুখর থাকে ক্লাস, আড্ডা আর স্বপ্নের গল্পে, সেখানে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নিরাপত্তা।
বৃহস্পতিবার (২২ জুলাই) রাতে বিজয়-২৪ হলের নারী ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে এক ক্যান্টিন কর্মীকে শিক্ষার্থীরা হাতেনাতে আটক করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ তিন দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবনের তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে তদন্তের স্বার্থে তালা খুলে দিলেও এখনো ক্লাসে ফেরেননি শিক্ষার্থীরা।
এ ঘটনার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা দেখা যায়। বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা একত্র হয়ে নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেন।
তাদের বক্তব্য, ওই ঘটনার সুষ্ঠ বিচার চাই এবং বিচারই যথেষ্ট নয়; এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে একই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন- ক্যাম্পাসে বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা জরুরি। কেউ বলছেন পর্যাপ্ত নজরদারির কথা, কেউ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের আখি আনিস বলেন, আমরা শুধু একটি ঘটনার বিচার চাই না। আমরা চাই এমন একটি ক্যাম্পাস, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিরাপদ অনুভব করবে।
বিজয় ২৪ হলে থাকা কেমিস্ট্রি ডিসিপ্লিনের মুমতাহিনা বলেন, হলের ভেতরে এখন আগের মতো স্বস্তি পাই না। একটা ঘটনা পুরো পরিবেশ বদলে দিয়েছে। আমরা চাই, প্রশাসন এমন পদক্ষেপ নিক যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী- বিশেষ করে ছাত্রীরা নিরাপদ ও সম্মানের সঙ্গে ক্যাম্পাসে থাকতে পারে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, অভিভাবকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন ব্যবস্থা নেবে যাতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং অভিভাবকদেরও দুশ্চিন্তায় না থাকতে হয়।
এদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিক জরুরি সভা করেছে। এসব সভায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা, ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল, ছাত্রীহলগুলোতে কর্মরত কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করা, ক্যান্টিন পরিচালনার জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতে ওই দুই ছাত্রী হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক আন্দোলন তাই শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক ক্যাম্পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। শিক্ষার্থীরা আর নীরব থাকতে চান না। তাদের প্রত্যাশা, এই প্রতিবাদ শুধু ক্ষণিকের আলোড়ন হয়ে না থেকে বাস্তব পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।
আরটিভি/এমএইচজে




