গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক; ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়: রাবি উপাচার্য

রাবি সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ 

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ০২:৩৭ পিএম


গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক; ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়: রাবি উপাচার্য
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬তম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের এবং গবেষণামুখী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বর্তমান প্রশাসন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসন নিশ্চিত, দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬তম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। ব্যাংকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা এই শিক্ষাবিদ সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন; করেছেন অধ্যাপনাও। মিলিটারি একাডেমিতেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তিনি। অধ্যাপনার ক্ষেত্রে পর্যটন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। 

সম্প্রতি আরটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন উপাচার্য ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরটিভির রাবি সংবাদদাতা ইসমাইল হোসেন সায়েম।  

আরটিভি: উপাচার্য হিসেবে বেশ কিছুদিন হয়েছে, আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন। আপনার মূল লক্ষ্য কী এবং আগামী চার বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?

উপাচার্য: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমি এই পদে এসেছি। সরকার আমাকে মনোনীত করেছে। আমার ছাত্র-ছাত্রীদের যেরকম আশা আছে, প্রত্যাশা আছে, আমারও একটা লক্ষ্য আছে। একজন ভাইস চ্যান্সেলর আসে চার বছরের জন্য। আমি চাইবো এই সময়ে শিক্ষা এবং গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন শুধু বাংলাদেশে না; পুরো পৃথিবীতেই একটা জায়গা করে নেওয়ার দিকে এগিয়ে যায়। বিশ্ব এখন অনেক এগিয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখন এআই, ড্রোন ও সাইন্টিফিক অনেক জিনিস নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমার লক্ষ্য আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে সেইরকম একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার, যেখানে আধুনিক বিশ্ব সৃষ্টিশীল কিছু তৈরি করছে সমাজের জন্য।

আরটিভি: আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং ও গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে আপনার কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?

উপাচার্য: আমরা আগে দেখতে পেতাম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক; মানে আমি ডেভেলপ হবো, আমি তাড়াতাড়ি প্রমোশন পাব— এজন্য আমার পিএইচডি দরকার আমার গবেষণা দরকার। কিন্তু, গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজকেন্দ্রিক, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বার্তাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে— গবেষণায় পর্যাপ্ত ফান্ড হচ্ছে না, অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। ইয়াং গবেষকরা বাইরে গিয়ে যে জ্ঞান আহরণ করবে, সেটাতেও সুযোগটা সীমিত হয়ে আসতেছে। কিন্তু, আমরা চাই যতটুকু রিসার্চ হোক, সেটা যেনো আমাদের দেশের জনগণের উপকারে আসে। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। একটা উন্নয়নশীল দেশের সমস্যাগুলোর যদি নিজস্ব সমাধান না থাকে, তাহলে সে দেশ এগোতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা অবশ্যই এই দিকে চিন্তা করবে, কীভাবে দেশ এগিয়ে যায়।  

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার দিক থেকে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে আছে। এখানে বেশ কিছু অনুষদ আছে যে অনুষদগুলোতে ইনোভেটিভ অনেক কাজ হচ্ছে রিসার্চে। আমরা চাচ্ছি এই কাজগুলো আরও বেশি হোক। অনেকে বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চের ফান্ড দেওয়া হয়নি। আসলে রিসার্চের ফান্ড দেওয়া হচ্ছে বা আছে। এই ফান্ডটি ডিস্ট্রিবিউট হবে এবং নিশ্চিতভাবে একটা কথা বলতে পারি যে এই ফান্ড আগের চাইতে বাড়বে। এটার প্রসেসটা চেঞ্জ হচ্ছে।

ইতোপূর্বে যেভাবে ফান্ডটা দেওয়া হতো, আমি একটু আগে যে কথাটা বললাম এটি সোসাইটির কল্যাণে আসবে কি না এবং ফান্ডটার যথাযথ ব্যবহার হবে কি না, এসব বিবেচনা করেই একটু দেরি হচ্ছে। ফান্ড যে কমে গেছে বা জিরো, এটি ঠিক না। ফান্ড ঠিকই আছে; বরং বাড়ছে। আমি যোগাযোগ রাখছি। ফান্ডটার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এর পদ্ধতিগত একটা পরিবর্তন আসছে। 

আরটিভি: শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে আপনার পরিকল্পনা কী?  

উপাচার্য: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে ৩৫-৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে। বাকি শিক্ষার্থীরা হল সুবিধা পাচ্ছে না, ওরা বাইরেই থাকে। এটা একটা বিরাট সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রই বাংলাদেশের খুব প্রান্তিক এরিয়া থেকে আসা। তারা আর্থিকভাবে অতটা স্বচ্ছল না। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে যে এত অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসন খুব অল্প সময়ে নিশ্চিত করাটাও চ্যালেঞ্জ। আমরা কয়েকটা স্তরে এই জিনিসটা ভাগ করে নিয়েছি। এখন তো ৩৪ শতাংশ আছে; তারপর ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে দিতে পারবো; এরপর ৭০-৮০ শতাংশ।

নতুন যে প্রজেক্টগুলো চলছে, এগুলো অনেক আগ থেকে শুরু হয়েছে। এখানে এমন কিছু অনিয়ম হয়েছে, যার কারণে প্রজেক্টগুলো পিছিয়ে দিচ্ছে। এখানে ৩-৪টা হল আছে, আমরা প্রচন্ড জোর দিয়েছি এই হলগুলোর কাজ যত তাড়াতাড়ি পারি যেন শেষ করা যায়। নিমার্ণ কাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা এমনিতেই ৫০ শতাংশের কাছাকাছি চলে যাবে। দ্বিতীয় দফায় ৬টি হলের নাম আমাদের অর্থপরিকল্পনার সবুজ পাতায় উঠেছে; এরপরে এটা একনেকে যাবে। একনেকে গেলে সেখানে আমরা কয়েকটা হল পাবো বলে আশা করছি। যদি পাই, তাহলে আবাসন চলে যাবে ৫০ শতাংশ থেকে ৭০-৮০ শতাংশে। এভাবে দফায় দফায় কাজ করলে একসময় দেখবো প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি চলে যাচ্ছি।

শিক্ষার্থীদেরকে বুঝতে হবে যে এটা স্বল্পমেয়াদী কোন কাজ না; এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী কাজ। আশা করি, আমার ছাত্র-ছাত্রীরা বুঝবে। বর্তমানে যারা ছাত্র-ছাত্রী আছে, তারা যদি এই সুযোগ নাও পায়; নিশ্চয়ই তাদের ছোট ভাই-বোনরা যারা আসছে, তারা এই সুযোগটা পাবে।  

আরটিভি: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচন আয়োজন নিয়ে কি ভাবছেন?  

উপাচার্য: সবকিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির উপরে। আমরা চাই শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকুক; পুরো বাংলাদেশেই থাকুক; থাকাটা স্বাভাবিক। এর মাধ্যমে সুবিধা হয়। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকলে তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবে। আগামীতে সবকিছুই নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি উপর।

আরটিভি: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন? 

উপাচার্য: আমার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমি যখন প্রথমে আসি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করেছি। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোনিবেশের জায়গাটা, পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার জায়গাটা, তাদের গবেষণায় ফিরে যাওয়ার জায়গাটা আনরেস্ট পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে এই মনস্তাত্ত্বিক আনরেস্টকে বজায় রেখে শিক্ষা কখনো নিশ্চিত হতে পারে না। 

কিছু বিভাগে সেশনজট রয়েছে। আমরা এ বিষয়টিতে কখনোই আপোষ করবো না। শিক্ষার্থীদের যেন একটা দিনও না দেরি হয়। যে যে ডিপার্টমেন্টে সেশনজট আছে ওখানে আমরা হাত দিয়েছি। আমরা এই চ্যালেঞ্জটাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করছি, যেন আমার কোনও ছাত্র-ছাত্রীকে একদিনও বেশি এখানে থাকতে না হয়। 

চব্বিশে ফ্যাসিবাদী সরকার চলে যাওয়ার পর অর্থনৈতিকভাবে তাদের লুটপাটের, তাদের কর্মকান্ডের খেসারত পুরো বাংলাদেশ বহন করছে। এরপরেও বর্তমান সরকার শক্ত হাতেই খুব সাহসিকতার সঙ্গে বাজেট ঘোষণা করেছে।

আমরা অবকাঠামোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি, আমাদের দিকে একটু তাকানোর জন্য। এর পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্য সংকট বা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি। এগুলোতেও আমরা হাত দিচ্ছি। পুরো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর যে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, তা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ফেস করছি। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সংকট কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের মেডিকেল সেন্টারটাকে কত ভালো করা যায়, তার জন্য একটা ভালো বাজেট আমি আনতে পেরেছি। 

ছেলেমেয়েদের হল কেন্দ্রিক যে সুবিধাগুলো; যেমন— তাদের রিডিং রুম, খাওয়া-দাওয়া... এগুলোতে আমরা নজর দিচ্ছি। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বিশাল জনবল সংকট দেখা দিয়েছে বা আছে। অনেকদিন থেকেই বেশ অনেক অফিসার অবসরে গেছেন। অনেকে মারা গেছেন। অনেক বিভাগে শিক্ষকের সংকট আছে। এই জিনিসগুলো নিয়ে চ্যালেঞ্জ আছে। মোট কথায় চ্যালেঞ্জের সংখ্যা বলতে গেলে অনেক। 

আরটিভি: বিগত প্রশাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে এক ধরনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান প্রশাসন নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে?  

উপাচার্য: সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিতের চেষ্টা করবো। একটা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকা অবশ্যই জরুরি। পাশাপাশি দক্ষ অফিসার; জনবল যেটা যেখানে লাগবে, সেখানে স্বচ্ছতার সাথেই নিয়োগ দেওয়া হবে।  

আরটিভি: কিছু কিছু বিভাগে সেশনজট রয়েছে। সেশনজট নিরসনে আপনার পদক্ষেপ কী? 

উপাচার্য: উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর আমি সকল বিভাগের সভাপতিদের সঙ্গে মিটিংয়ে বসে সেশনজট শুন্যের কোটায় নিয়ে আসার একটা বার্তা দিয়েছিলাম এবং এর ফলাফল আমরা পেতে শুরু করেছি। 

আরটিভি: উপাচার্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী; তাদেরকে কী বার্তা দিতে চান?

উপাচার্য: শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলতে চাই, প্রথাগত নোট পড়ে পাস করে আমি চাকরিতে ঢুকলাম বা চাকরির চেষ্টা করলাম; উচ্চশিক্ষা কিন্তু এই পর্যায়ে আর নেই। একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ, বিশ্বে কী ঘটছে তাকিয়ে দেখুন। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বা আপনার সেই মুখস্ত বিদ্যার উপর ভরসা করবেন না, প্লিজ। 

সাবজেক্টের পাশাপাশি বেশ কিছু সফট স্কিলের প্রয়োজন হচ্ছে। যদি প্রতিযোগিতায় টিকতে চান, তাহলে অবশ্যই নিজেকে গড়ুন। নিজের দিকে খেয়াল করুন। আপনার সময় খুবই মূল্যবান। এই চার-পাঁচটি বছর রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে যখন কাটাচ্ছেন, এটি শ্রেষ্ঠ সময় নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার। বাংলাদেশের জন্য তথা বিশ্বের জন্য নিজেকে তৈরি করুন। এই সুযোগ আর দ্বিতীয়বার পাবেন না। 

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission