সব শ্রেণি–পেশার মানুষের প্রতি সম্মান, দায়িত্বের উপর অবিচল, প্রতিকূল মুহূর্তে ইস্পাত কঠিন ধৈর্যের পরিচয়, বিপদের সময়ে মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত, আর শত্রুর সঙ্গে কোনো আপোষ না করার মানসিকতা। এসব গুণ তাকে আলাদা করে চিনিয়েছিল বিশ্ববাসীর কাছে। বলছি সংগ্রামী নেত্রী ও বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা। একজন নীরব গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নারী। ভোটের মাঠে যার জনপ্রিয়তার কাছে প্রতিদ্বন্দ্বীরা বরাবরই হেরে যেতেন।
দিনাজপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অভ্যাস ছিল ছোটবেলা থেকেই। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম তার। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার তখন ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন, আর তার আদি বাড়ি ছিল ফেনীতে। পড়াশোনা দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ পর্যন্ত এগোয়। রাজনীতির সঙ্গে তখনো তার কোনো যোগ ছিল না। জীবন তখন ছিল পরিবার, পড়াশোনা আর সংযত আচরণকে ঘিরে।
সব বদলে যায় ১৯৬০ সালে, যখন তার বিয়ে হয় সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। সংসার, স্বামীর ব্যস্ততা, সন্তানদের বড় করা, সবই তিনি নিজের মতো করে সামলে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়া যখন ফ্রন্টলাইনে, পরিবারের ভার তখন তার কাঁধে। পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলেও, তিনি তখনও রয়ে যান নীরবে। তবে দায়িত্বশীল ফার্স্ট লেডি ওই সময়ই তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার আর নেদারল্যান্ডসের রানি জুলিয়ানার মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়া খুন হলে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ঢেউ। বিএনপির ভেতরেও দেখা দেয় নেতৃত্বহীনতা। ঠিক তখনই দলের শীর্ষ নেতারা তার মধ্যে দেখতে পান গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের ছায়া। রাজনীতির বাইরে থাকা এই নারীই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মুখ। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন। এক বছরের মধ্যেই তিনি ভাইস-চেয়ারম্যান, আর ১৯৮৪ সালে হন দলের চেয়ারপারসন।
এরপরই শুরু হয় তার সংগ্রামী রাজনৈতিক যাত্রা। ১৯৮২ সালের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি সামনে থেকে আন্দোলন চালান। মিছিলে থাকেন, গ্রেপ্তার হন বারবার। ইতিহাস বলে, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত মোট সাতবার গ্রেপ্তার হন। তার নেতৃত্বে ছাত্রদল শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়। ওই সময় ৩২১টির মধ্যে ২৭০টি ছাত্র সংসদে জয় নিয়ে আসে। এই তরুণরাই পরে এরশাদের পতনের আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখে। তখনই তিনি পরিচিত হন “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা তখন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপ নেয়। তার সময়ে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, গ্রামীণ উন্নয়ন এগোয় দ্রুত। তৈরি পোশাকশিল্পে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান বাড়ে ২৯ শতাংশ, আর দুই লাখ নারী এই খাতে কাজের সুযোগ পান। তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের বিষয় তুলেছিলেন, আর ১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউসে গিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সমস্যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেন।
১৯৯৬ সালে বিএনপির বিজয়ের পর তিনি দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নিলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও সরকার গঠন করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদের ফ্রি টিউশন, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং—এসব সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনে। সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ করা হয়, বাজেটেও শিক্ষা খাত পায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ২৯তম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
২০০৭ সালে তাকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলে আন্তর্জাতিক মহল এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মন্তব্য করে। ২০১১ সালে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাকে সম্মান জানায় “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” উপাধিতে। ২০১৮ সালের জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১৭ বছরের সাজা—এ নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ ছিল যথেষ্ট।
গৃহবধূ থেকে দলের নেতা, দল থেকে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব—এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি ধাপেই ছিল দায়িত্ব, সাহস আর স্থিরতা। আর এভাবেই তিনি পরিচিত হন “দেশনেত্রী” হিসেবে। বয়স, অসুস্থতা আর রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা সত্ত্বেও তিনি দেশের রাজনৈতিক ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতেই থেকেছেন। তাঁর এই সংগ্রামী যাত্রাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাকে অমর করে রাখবে।
আরটিভি/এআর




