মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের আমলে ছাত্রলীগের নেতারা শিক্ষার্থীদের যে নির্যাতন করতেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিবরণ তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্যার এফ রহমান হলে থাকা নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগের উপ দপ্তর সম্পাদক আরিফ ইশতিয়াক রাহুল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত বছর যে ১২৮ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছিল, তাদের মধ্যে রাহুলও রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে তিনি এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন।
পোস্টে রাহুল লিখেন, আমার কিছু কথা আছে৷ আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক রাতের স্মৃতি। যেগুলো বলার জন্য আমি অপেক্ষা করেছি বেশ কিছু বছর। দল ক্ষমতায় থাকতে এই কথাগুলো বললে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা কথাগুলো লুফে নিত। ছাত্রলীগ চাপে পড়ত। তাই বলিনি। কিন্তু এখন বলা প্রয়োজন মনে করছি।
২০২২ সালের ১৪ এপ্রিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম পহেলা বৈশাখ। প্রগতিশীল ধারার সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে এই দিনটি আমার কাছে দুইটা ঈদের চেয়ে কোনো অংশে কম আনন্দের নয়। ২০১৮ থেকে ২০২১— এই চারটা বছর মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছি আর প্রতিবারই ভেবেছি, কোনো একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, তখন হল থেকে এসে শোভাযাত্রায় অংশ নেব। বলতে গেলে এটা আমার কাছে এক রকম স্বপ্নের মতো ছিল। ২০২২ সালে এসে আমার সেই দিনটি আসে। আমি খুবই রোমাঞ্চিত ছিলাম। তখনও ক্যাম্পাসে বাইক আনিনি। এপ্রিলের শুরু থেকে প্রতিদিনই হেঁটে হেঁটে চারুকলায় যেতাম। ঘুরেফিরে কাজ দেখতাম। ছবি তুলতাম। মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার জন্য পহেলা বৈশাখের আগের রাতে আজিজে গিয়ে একটা পাঞ্জাবিও কিনেছিলাম।
এখন যেমন মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে জলঘোলা হচ্ছে তখনও হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী গোষ্ঠী বিপুল সমারোহে মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাল। মঙ্গল শোভাযাত্রায় কাউকে না যাওয়ার জন্য ক্যাম্পেইন করল। এ নিয়ে কয়েকদিন ফেসবুকও খুব গরম ছিল। যে কারণে আমার মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার ইচ্ছেটা আরও বেড়ে যায়।
সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে এই ছাত্রলীগ নেতা লিখেন, ১৪ এপ্রিল খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠলাম। খুব ভোরবেলা বলতে যে সময় উঠলে শোভাযাত্রায় যেতে সুবিধা হয় সে সময়। ১০৩ নং রুমে থাকতাম তখন। রুমটা ছিলো গণরুম, আমরা অলমোস্ট ২০-২২ জন ছিলাম রুমে। তাড়াতাড়ি চারুকলায় পৌঁছানোর জন্য দ্রুত সময়ের মধ্য গোসল করে নতুন পাঞ্জাবি-পাজামা পরে রুম থেকে কেবল বের হয়েছি, দরজা খুলেই দেখি সাদ্দাম ভাই সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। আমাদের রুমের সামনেই সিঁড়ি। কমলা রঙের পাঞ্জাবি পরেছেন। বৈশাখ-বৈশাখ একটা ভাব আছে। ওনাকে দেখে দরজার সামনে দাঁড়ালাম। উনি দরজার সামনে আসলে সালাম দিয়ে বললাম, ভাই, আপনার সাথে একটা ছবি তুলব। সাদ্দাম ভাই বললেন, এখানে অন্ধকার, ভালো ছবি আসবে না, বাইরে চলো।
এর পরের ঘটনা তুলে ধরে রাহুল লিখেন, আমি সাদ্দাম ভাইয়ের পেছন পেছন হলগেটে গেলাম। গিয়ে দেখি মুন ভাইসহ পুরো হল ছাত্রলীগ সাদ্দাম ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। সবাই সাদ্দাম ভাইকে সালাম দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে সাদ্দাম ভাই মুন ভাইকে বললেন, দাঁড়াও, ও একটা ছবি তুলতে চায়।
তিনি আরও লিখেন, কার হাতে ক্যামেরা দিলাম মনে নেই। সাদ্দাম ভাইয়ের সেই আমার খুব সুন্দর একটা ছবি উঠল। আমার ও সাদ্দাম ভাইয়ের একদম সামনেই মুন ভাই দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তখন মুন ভাইয়ের রাজনীতি করি। নেতা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাপারটা চোখে ভালো লাগল না, তাই মুন ভাইকে বললাম, ভাই, আপনিও আসেন (ছবিতে)। মুন ভাইও আসলো। তিনজন মিলে একটা ছবি হলো। আমি বের হয়ে গেলাম। ওনারা সবাই এই সুযোগে সাদ্দাম ভাইয়ের সাথে ছবি তুলল। এই ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু শেষ হলো না।
ঘটনার বর্ণনার প্রেক্ষিতে তিনি লিখেন, এরপর সারাদিন খুব আনন্দের সাথে কাটালাম। রোজার দিন ছিল তখন। রোজা রেখে সারাদিন এতবেশি হাঁটাহাঁটি করলাম যে বিকেল থেকেই অসুস্থ লাগা শুরু হলো। এ কারণে রাতে আর হলে গেলাম না, অসুস্থ শরীরে যাতে গেস্টরুম না করতে হয়। রাতে একাত্তর হলে হানিফ ভাইয়ের রুমে গেলাম। উনি কি যেন রান্না করছিল, আমি জিনিসপত্র এগিয়ে দিচ্ছিলাম। এই সময় হল থেকে এক বন্ধু কল দিলো। স্পষ্টতই বুঝতে পারলাম, গেস্টরুমে যাওয়ার জন্য কল দিচ্ছে। কলটা না ধরে ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিলাম। কিছুক্ষণ পর ফোন হাতে নিয়ে দেখি, আরও ৩ জন মিলে ১০-১২টা কল দিয়েছে। এটা দেখে আরও শিওর হয়ে গেলাম, গেস্টরুমে আমাকে খুঁজছে।
রাহুল লিখেন, কিছুটা ভয় লাগতে শুরু করল। রান্নার কাজ ততক্ষণে শেষ। ফোন তখন হাতে। একটু পরে মান্নার কল। টানা কল। ১০ মিনিটে মনে হয় ২৫টা কল দিয়েছে। এত কল দেখে বুঝে গেলাম, খুব ভয়ানক কিছু ঘটেছে। কল না ধরে আর উপায় নেই। কলটা ধরলাম।
কল ধরার সাথে সাথে মান্না কান্না-কান্না কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল- রাহুল, তুই কই? আমি বললাম- আমি একাত্তর হলে, কেনো? বললো- তোর জন্য ভাইয়েরা সবাইকে খুব প্যারা দিচ্ছে, তুই তাড়াতাড়ি হলে আয় প্লিজ।
তিনি লিখেন, আমার জন্য সবাইকে প্যারা দিচ্ছে। না গিয়ে আর উপায় কি? আমি গেলাম। ১০৮নং রুমে গেস্টরুম বসেছে। গেস্টরুমের নিয়মানুযায়ী ১০৩নং রুম থেকে একটা ফরমাল শার্ট পরে ১০৮নং রুমে গেলাম। রুমে ঢুকে সালাম দিলাম। গেস্টরুমের নায়কেরা একেকজন রেগে অগ্নিশর্মা। আমি যাওয়ার সাথেই সবাইকে রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলল। আমাকে একা রেখে কেউ বের হলো না। পিটিয়ে বের করে দিলো সবাইকে। বুঝে গেলাম, সিঙ্গেল গেস্টরুম হবে আমার।
পরের ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি লিখেন, রুমে আমার ব্যাচমেট আর কেউ নেই। একদিকে আমি, অন্যদিকে ইমিডিয়েট সিনিয়র ১৫-২০ জন। এর মধ্যে স্ট্যাম্প নিয়ে বসলো কেউ কেউ। স্ট্যাম্প রুমেই ছিল। কেউ গালাগালি শুরু করল, কেউ প্রশ্ন করতে শুরু করল। একসাথেই চলল সব।
গেস্টরুমের নিয়মানুযায়ী সিনিয়রদের কথার কোনো উত্তর দেওয়া যাবে না। উত্তর দিলেই বিপদ। তাই চুপ করে থাকলাম। এরমধ্যে চড়-থাপ্পড় হয়ে গেছে কয়েক দফা। ক্রমাগত বালিশ মারছিল। যে যেভাবে পারল মারল। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।
রাহুল লিখেন, যেসব ‘অপরাধের’ কারণে তাকে নির্যাতন করা হয়, তার বিবরণ এরপর তাকে শোনানো হয়- তারা আমার অপরাধনামা শোনালো।
অপরাধগুলো- ১. আমি কার থেকে অনুমতি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় গিয়েছি?
২. আমি কেনো সাদ্দাম ভাইয়ের সাথে ছবি তুললাম?
৩. আমি কেনো মুন ভাইকে ‘আপনিও আসেন’ বললাম?”
গেস্ট রুমে নিজে ‘নির্যাতিত হওয়ার’ বিবরণ তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরিফ ইশতিয়াক রাহুল লিখেন, আমি অবাক হয়ে গেলাম, এ কেমন ছাত্রলীগ যারা মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার জন্য এভাবে মারছে?
তিনি লিখেন, এতক্ষণ আমি মার খেতে খেতে ভাবারই সময় পাইনি, আমাকে কেন মারছে? অপরাধগুলো শুনে বুঝতে পারলাম, মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার জন্য ও সাদ্দাম ভাইয়ের সাথে ছবি তোলার জন্য আমার সিঙ্গেল গেস্টরুম হচ্ছে।
এর মধ্যে একজন রুমের লাইট অফ করে দিলো। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে একজন থাপ্পড় মারল। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। বেকায়দাজনকভাবে মেঝেতে পড়ে গেলাম। আমি মাটিতে পড়ে থাকতে ৩-৪ জন উঠে এসে আমাকে মারতে শুরু করল। কেউ লাথি দিলো, কেউ পা দিয়ে ডলা দিলো, কেউ ফুটবলের মতো শট মারল।
একটু পরে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। উঠে দাঁড়াতে বললো। দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম- পারলাম না। এতক্ষণ তেমন ব্যথা বুঝতে পারিনি। এই সময় অসহ্য যন্ত্রণা হলো। ডান চোখের নিচে জ্বলছিলো। কোমরে এত জোরে কিছু লাথি লেগেছিল যে বসতেও পারলাম না, দাঁড়াতেও পারলাম না। তাও কোনো রকমে উঠে বসলাম। দাঁড়াতে পারছি না বলে হিজড়া, ধ্বজভঙ্গ, ল্যাংড়া ইত্যাদি বলে টিটকারি করছিল।
এ সময় একজন ফোন দেখতে চান জানিয়ে রাহুল লিখেন, দিলাম। ইচ্ছেমতো ঘাঁটাঘাঁটি করল। কেনো ফোন ঘাঁটছে আমি বুঝতে পেরেছিলাম। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে শিবির বানিয়ে হল থেকে বের করে দেবে। কিছুই পেলো না। পাওয়ার মধ্যে পেলো আমার আইডি দিয়ে খোলা কিছু পেইজ, এর মধ্যে একটা ছিলো খায়রুজ্জামান লিটনের নামে। এই পেইজ থেকে আমি ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন প্রচার করতাম। বড় নেতাদের নামে পেইজ হলে রিচ ভালো হয়। তাই খায়রুজ্জামান লিটনের নামে খুলেছিলাম।
ছাত্রলীগের এই নেতা লিখেন, আমি কেনো খায়রুজ্জামান লিটনের নামে পেইজ খুলেছি সেটা নিয়ে আরও কিছু সময় চলল। সে সময় মেরেছিল কি না মনে নেই। শরীরের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। অলরেডি চোখের নিচে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।
অবস্থা বেগতিক দেখে ওনারা নিজেরা নিজেরা কি যেন আলোচনা করল। ব্যথার তীব্রতায় এসব লক্ষ্য করিনি। একটু পর অটো ডেকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলো। সাথে উনাদের মধ্যে তুলনামূলক ভালো দুইজন গেলো।
রাহুলের ভাষায়, ডাক্তার দেখলো। কিছু ওষুধ দিলো। এরমধ্যে একটা ওষুধ খাওয়ার জন্য আগে কিছু খেতে নিতে হবে। একটা কলা ও হাফ তেহারি এনে দিলো। চুলায় রান্না রেখে এসেছিলাম, রাতে খাওয়া হয়নি। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছিল। সেহরির সময়ও শেষের দিকে। তাড়াতাড়ি কলা ও তেহারি খেয়ে নিলাম।
ডাক্তার দেখল। ঘটনা কী সেটা বুঝতে পেরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল হওয়ায় ডাক্তারও চুপ থাকল। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হলে পাঠিয়ে দিলো।
ঘটনা যে তখনও শেষ হয়নি, সে কথা তুলে ধরে রাহুল লিখেন, হলে এসে কিছুক্ষণ বসে সেহরির পর আরেক দফা গেস্টরুম। এবার আর মারল না। গালাগালিও একটু কমই করল। কিন্তু আমার অপরাধ অনেক বড়, তাই এটুকু শাস্তি দিয়ে হবে না। আরেকটু শাস্তি হতে হবে।
বাড়তি শাস্তি হিসেবে যোগ হলো ৭ দিনের জন্য হল থেকে বহিষ্কার। ৭ দিন আমি হলে থাকতে পারব না। আমার জিনিসপত্রও হলে রাখতে পারব না। সকাল হওয়ার আগেই হল ছাড়তে হবে। আমি সকাল হওয়ার আগেই হল থেকে বের হয়ে গেলাম। একাত্তর হলের গণরুমে তৈমুরের কাছে কয়েকদিন ও শাহ নেওয়াজ হোস্টেলে শাহ আলমের কাছে কয়েকদিন থাকলাম।
এতদিন চুপ থেকে এখন উচ্চকণ্ঠ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে রাহুল লিখেছেন, এত বড় ঘটনা খুব বেশি লোকের কাছে বলিওনি। বাসায়ও না। কেন জানেন? লোক জানাজানি হলে বিশাল বড় নিউজ হত, পুরো দায় আসত ছাত্রলীগের ওপরে। সিনিয়র কারো কাছে বিচার দিলে এটা নিয়ে জলঘোলা হতো। হলের সিনিয়রদের চক্ষুশূল হতাম আমি। হলে থাকতে পারতাম না।
হলে না থাকলে ছাত্রলীগ করতে পারতাম না। বাসায় জানালে এক মুহূর্তের জন্যও হলে থাকতে দিত না। যারা এভাবে নির্যাতন করেছে তারাও জানত, আমাকে যতই মারুক, আমি ঘটনা গোপন রাখব। তাই বার বার আমাকেই মেরেছে। এটা এক রাতের কথা বললাম, এ রকম ৮টা সিঙ্গেল গেস্টরুমের স্মৃতি আছে আমার।
আরটিভি/এমএইচজে



