যে অপরাধের ‘কঠিন’ শাস্তি থেকে রেহাই নেই ইহকাল ও পরকালে

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫ , ০৪:৫১ এএম


যে অপরাধের ‘কঠিন’ শাস্তি থেকে রেহাই নেই ইহকাল ও পরকালে
প্রতীকী ছবি

এই পৃথিবীতে প্রতিদিনই বড়দেরকে ছোটদের ওপর, শক্তিশালীদেরকে দুর্বলদের ওপর, ধনীদেরকে গরিবদের ওপর, মালিকদেরকে কর্মচারীদের ওপর, শাসকদেরকে জনগণের ওপর কোনো না কোনোভাবে জুলুম বা অত্যাচার করতে দেখা যায়। এটা খুব কঠিন অপরাধ। ইসলামের দৃষ্টিতে, এই অপরাধের শাস্তি শুধু পরকালেই নয়, দুনিয়াতেও পেতে হয়।

বিজ্ঞাপন

যে ব্যক্তি জুলুম করে তাকে বলা হয় ‘জালিম’ আর যার প্রতি জুলুম করা হয় তাকে বলা হয় ‘মজলুম’। ইসলামে ‘মজলুম’ খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। জালেম ধ্বংস হয় মজলুমের বদদোয়ায়। মহানবী (স.) যাদেরকেই বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনকার্যের দায়িত্ব দিতেন, সবাইকেই মজলুমের বদদোয়া থেকে সতর্ক করতেন। অর্থাৎ সামান্য অসাবধানতার কারণে যেন কারো ওপর জুলুম না হয়ে যায়। মজলুমের আর্তনাদ আল্লাহর কাছে পৌঁছতে কোনো পর্দা ভেদ করতে হয় না। 

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (স.) যখন মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠান, তাকে বলেন, ‘মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করবে। কেননা তার ফরিয়াদ এবং আল্লাহর মধ্যে পর্দা থাকে না।’(বুখারি: ২৪৪৮) 

বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন

আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে রাখি। আমার কৌশল অতি শক্তিশালী।’ (সুরা নুন: ৪৫) আল্লাহ পাক আরও বলেন,  ‘জালেমরা যা করছে, সে সম্পর্কে তোমরা আল্লাহকে উদাসীন ভেবো না, তিনি তাদের ছাড় দিয়ে যাচ্ছেন ওই দিন পর্যন্ত, যেদিন চোখগুলো সব আতঙ্কে বড় বড় হয়ে যাবে’(সুরা ইবরাহীম: ৪৩) অন্য আয়াতে তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, এমনই ছিল তোমার রবের ধরপাকড়, যখন তিনি ধরেছিলেন ওই জালেম বসতিগুলোকে, নিশ্চয়ই তার ধরা অনেক কঠিন যন্ত্রণাময়। (সুরা হুদ: ১০২)

আল্লাহ তা’আলা অত্যাচারী ফেরাউনকে নীল নদের পানিতে ডুবিয়ে মেরেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর তাদের সবাইকেই আমি (তাদের) নিজ নিজ পাপের কারণে পাকড়াও করেছি, তাদের কারো ওপর প্রচণ্ড ঝড় পাঠিয়েছি, কাউকে মহাগর্জন এসে আঘাত হেনেছে, কাউকে আমি জমিনের নিচে গেড়ে দিয়েছি, আবার কাউকে আমি (পানিতে) ডুবিয়ে দিয়েছি’। (সুরা আনকাবুত :৪০)

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর অবশ্যই আমি বহু জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি তাদের জুলুমের কারণে। আর তাদের কাছে তাদের রাসুলরা সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিল, কিন্তু তারা ঈমান গ্রহণ করেনি। আর এভাবে আমি অপরাধী জাতিকে শাস্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা ইউনুস: ১৩)

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দুটি পাপের শাস্তি আল্লাহ তাআলা আখেরাতের পাশাপাশি দুনিয়ায়ও দিয়ে থাকেন। তা হলো, জুলুম ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি।’(তিরমিজি: ২৫১১)

মানবতার বিচারে জুলুম এতই অপছন্দনীয় যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজের জন্যও এটি হারাম করেছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘হে আমার বান্দা, আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও তা হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (মুসলিম: ৬৭৩৭)

হাদিস শরিফে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া আল্লাহর কাছ থেকে ফেরত আসে না। এক. ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া। দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। তিন. মজলুমের দোয়া। আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে তুলে নেন এবং তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেন। মহান রব বলেন, আমার সম্মানের শপথ, কিছুটা বিলম্ব হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব।’ (তিরমিজি: ৩৫৯৮)

আরও পড়ুন

কেয়ামতের মাঠে জালেম বঞ্চিত হবেন সব ধরনের করুণা থেকে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জুলুমের মাধ্যমে কারো যে পরিমাণ জমি অন্যায়ভাবে দখল করে নেয়, কেয়ামতের দিন এর সাত গুণ জমি তার গলায় বেড়ি বানিয়ে দেয়া হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম: ২২৯১)

তাই কারো ওপর জুলুম হয়ে গেলে, যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। দেরি করা যাবে না। অন্যথায় খোদায়ি শাস্তির অপেক্ষা করতে হবে। এমন যেন না হয় যে, মজলুমের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আগেই আল্লাহর ডাক চলে আসে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়, ওই দিন আসার আগে, যে দিন তার কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে, তার জুলুমের পরিমাণ তার কাছ থেকে নেওয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে, তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি: ২৪৪৯)

সুতরাং জুলুম যেন না হয়, সেজন্য ক্ষমতাসীন ও সবলদের সতর্ক থাকতে হবে। জালেমদের শাস্তি দেখে শিক্ষা নিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর কতই না উত্তম হতো যদি জালিমরা দুনিয়াবি কোনো শাস্তি দেখে উপলব্ধি করে নিত যে, সব ক্ষমতা শুধু আল্লাহ তায়ালার জন্য এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা বাকারা: ১৬৫)

আরও পড়ুন

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, ‘কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে বিষয়ে বিচার ফায়সালা করা হবে, তা হবে রক্তপাতের বিচার।’ (সহিহ মুসলিম: ১৬৭৮)

পরকালে জালিমদের ওপর শাস্তি কখনোই হালকা অথবা ক্ষণস্থায়ী হবে না, বরং তা হবে চিরস্থায়ী ও অত্যন্ত কঠোর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যারা জুলুম করেছে তাদেরকে বলা হবে তোমরা স্থায়ী আজাব ভোগ করো। তোমরা যা অর্জন করতে তোমাদেরকে কেবল তারই জাজা তথা প্রতিদান দেয়া হচ্ছে।’ (সুরা ইউনুস: ৫২) এ সম্পর্কে অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আর জালিমরা যখন আজাব প্রত্যক্ষ করবে, তখন তাদের থেকে বিন্দুমাত্র আজাব হ্রাস বা কমানো হবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না।’ (সুরা নাহল: ৮)

আসুন, আমরা আল্লাহ তাআলার আদালতে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার আগে আল্লাহর আজাব-গজবকে ভয় করে সর্বপ্রকার জুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকি। আল্লাহ তা’আলা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরটিভি/এসএইচএম

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission