সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে গিয়ে প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে নানা রঙের অসংখ্য ঝিনুক ও শামুকের খোলস। কখনো সেগুলো রঙিন, কখনো ফ্যাকাসে সাদা, কখনো আবার ভাঙাচোরা। শিশুরা এগুলো কুড়িয়ে নেয় খেলনার মতো, বড়রা রাখে স্মারক হিসেবে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে এই ঝিনুকের খোলস আসলে কীভাবে তৈরি হয়, কোথা থেকে আসে?
ঝিনুকের খোলস মূলত এক ধরনের কঙ্কাল। মানুষ ও স্থলজ প্রাণীর কঙ্কাল থাকে শরীরের ভেতরে, কিন্তু ঝিনুক, শামুক, স্ক্যালপসহ সামুদ্রিক মোলাস্ক প্রাণীদের কঙ্কাল থাকে শরীরের বাইরে। একে বলা হয় বহিঃকঙ্কাল।
এই খোলস তাদের নরম দেহকে শিকারি প্রাণী, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং ঢেউয়ের আঘাত থেকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে এটি পেশি সংযুক্ত করার একটি শক্ত কাঠামো হিসেবেও কাজ করে। অনেক ঝিনুক এই খোলস ব্যবহার করেই চলাফেরা করে বা বালুর নিচে দ্রুত লুকিয়ে পড়ে।
ঝিনুকের খোলস তৈরির প্রক্রিয়াকে বলা হয় জৈব খনিজকরণ। সমুদ্রের পানি থেকে ঝিনুক ক্যালসিয়াম কার্বনেট সংগ্রহ করে ধীরে ধীরে শক্ত খোলস তৈরি করে। এই খনিজই চুনাপাথরের প্রধান উপাদান।
প্রতিটি প্রজাতির ঝিনুকের খোলসের গঠন আলাদা। কেউ গোলাকার, কেউ লম্বাটে, কেউ আবার ঢেউখেলানো নকশার। পৃথিবীতে বর্তমানে ৫০ হাজারেরও বেশি মোলাস্ক প্রজাতি রয়েছে, যার ফলে সমুদ্রসৈকতে খোলসের রঙ ও আকৃতির বিশাল বৈচিত্র্য দেখা যায়।
যখন ঝিনুক মারা যায়- তখন এর নরম দেহ পচে যায়, কিন্তু শক্ত খোলস রয়ে যায়। সাগরের ঢেউ ও স্রোতের টানে সেই খোলস ভেসে উঠে আসে তীরে। অনেক খোলস আবার সমুদ্রতলের পলির নিচে চাপা পড়ে থাকে। পরে হাজার হাজার বছর ধরে চাপ ও সময়ের প্রভাবে পলি শক্ত পাথরে রূপ নেয়, আর সেই খোলস পরিণত হয় জীবাশ্মে। বিজ্ঞানীদের মতে, সামুদ্রিক খোলসই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দেখা জীবাশ্মগুলোর একটি।
ঝিনুকের খোলস শুধু সৌন্দর্যের বস্তু নয় এগুলো ইতিহাসের দলিল। বিজ্ঞানীরা কার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে খোলসের বয়স নির্ধারণ করেন। খোলসে থাকা রেডিওকার্বনের পরিমাণ সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে যায়। সেই হিসাব করেই জানা যায়- একটি খোলস শত বছরের পুরোনো নাকি হাজার বছরের।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সমুদ্রসৈকতে পাওয়া ঝিনুকের খোলস কয়েক শতাব্দী এমনকি কয়েক হাজার বছর আগেরও হতে পারে।
ঝিনুকের খোলস আমাদের শুধু বয়স নয়, অতীতের পরিবেশের কথাও জানায়। খোলসের ভেতরের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন-তখন সমুদ্রের তাপমাত্রা কেমন ছিল, পানিতে লবণের মাত্রা কত ছিল, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের চিহ্নও ধরা পড়ে।
সমুদ্রতীরে পড়ে থাকা একটি ছোট ঝিনুকের খোলসের ভেতর লুকিয়ে থাকে হাজার বছরের গল্প। এটি আমাদের শেখায় প্রকৃতির ধৈর্য, সময়ের শক্তি আর জীবনের বিস্ময়কর অভিযোজন ক্ষমতা।
পরেরবার সমুদ্রসৈকতে গেলে যখন একটি খোলস কুড়িয়ে নেবেন, মনে রাখবেন- আপনার হাতে ধরা সেই ছোট্ট বস্তুটি হয়ত বহন করছে পৃথিবীর বহু পুরোনো ইতিহাস।
আরটিভি/এমএইচজে





